বাংলাদেশ, শুক্রবার, ৭ মে ২০২১ ২৪শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

বিপর্যস্ত শহরে দিশেহারা দিন এনে দিনখাওয়া মানুষ


প্রকাশের সময় :১৯ এপ্রিল, ২০২১ ৮:৪৭ : পূর্বাহ্ণ

জাফর আহমদঃ

“এসেছে বন্যা, এসেছে মৃত্যু পরে যুদ্ধের ঝড় মন্বন্তর রেখে গেছে তার পথে পথে স্বাক্ষর।” প্রায় ৭০ বছর আগে কবি সুকান্ত গান্ধীবন্দনায় বন্যা, যুদ্ধ আর খাদ্য অভাবের চিত্র তুলে ধরেছেন। তুলে ধরেছেন বন্যা, ঝড় আর মন্বন্তরের আঘাতে ক্ষত বিক্ষত মানুষের লাশের চিত্র। নিরন্ন মানুষের চিত্র। কিন্তু সব চিত্র মলিন হয়ে গেছে রাজধানী ঢাকায় কঠোর লকডাউনে ভাত হীন মানুষের আহাজারিতে। ঘরে থাকলে সন্তান সন্তততির খাবারের জন্য করুন দৃষ্টি। আর বাইরে বের হলে পুলিশের লাঠিপেটা। উভয় সংকটে রাজধানীর দিন এনে দিন খাওয়া শ্রমজীবি ও স্বল্প পুঁজির ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। দিন এনে দিন খাওয়া এ সব মানুষ থাকছে না খেয়ে, আধা খেয়ে। স্বল্পপুঁজির মানুষ পুঁজি খেয়ে ফেলে এখন দুমুঠো খাবারের প্রানান্ত চেষ্টায়। তাতেও কি মিলছে!

করোনার দ্বিতীয় আক্রান্ত ও মৃত্যুতে প্রতিদিন নতুন নতুন রেকর্ড হচ্ছে। এই মহামারী মৃত্যু রোধে আবার ঘোষিত হয়েছে লকডাউন। এ লকডাউনের বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ। এই লকডাউনের মধ্যেই বাইরে বের হয়ে মানুষ কিছু করার চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে রিকসাওলাদের কিছু রোজগারের সুবিধা থাকলেও সব কিছু বন্ধ থাকার প্রভাব পড়েছে অন্য পেশার শ্রমজীবি কুলি-মুটে, পরিবহনের হেলপার, ফুটপাতের ছোট্ট ব্যবসায়ী, মার্কেটের কর্মচারিদের। তাদের অবস্থা খুবই খারাপ। এসব শ্রমজীবি মানুষ করোনার প্রথম ধাপের আঘাত থেকে পুরোপুরি বের হয়ে আসতে পারেনি, সবেমাত্র আবার কর্মে ফিরেছে। রোজ রোজ রোজগার করে যা কিছু হতো তা দিয়ে সংসার চলছিল মাত্র। করোনার দ্বিতীয় ধাপের লকডাউনের প্রথম দিনে থেকেই তাদের ছিকেই টান পড়েছে। যত দিন অতিবাহিত হয়েছে সংকট তত ঘনিভূত হয়েছে। সঞ্চয় বলে আদৌতে কিছু ছিল না এ সব মানুষের। চলতি লকডাউনে একটি দিন যাওয়া মানে এ সব শ্রমজীবি মানুষের বুকের উপর থেকে এক একটি পাথর চেপে বসা। কিন্তু কবে এই সংকট কাটবে কেউ জানে না।

রোববার দুপুরে মিরপুর-২ নম্বরে থানার সামনে সড়কের পাশে প্রখর রোদের মধ্যে কথা হয় রিকসাচালক রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। রফিকুল ইসলামসহ তিন জনের রিকসা পুলিশ আটক করে সড়কের পাশে উল্টো করে রেখে দিয়েছে। রফিকুল ইসলামের বয়স পঞ্চাশ উর্দ্ধ হবে। বাকী দু’জনের ৩০ এর মত হবে। রফিকুলের দাঁতে প্রচন্ড ব্যাথা। মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না। ফুটওভার ব্রীজের ছায়ায় রফিকুল বসে আছেন। অন্য দু’জন ফুটপাতের উপর, পুলিশের সামনে। রফিকুলের কাছে যেতেই উঠলেন, তার সংসারে সন্তান স্ত্রীসহ চারজন আছে। উইমেন্স কলেজের পাশে বস্তিতে থাকেন। দুইদিন ধরে ঘরে কোন খাবার নেই। দোকানদার বাকী দিচ্ছে না। স্ত্রী সন্তানকে বুঝিয়ে রিকসা নিয়ে বের হয়েছে কিছু মেলে কি না। সকাল থেকে তিনটা ভাড়া মেরেছে। তাতে জমার টাকা হয়েছে। এখন কিছু টাকা নিজের জন্য ভাড়া মারতে হবে। অপেক্ষা করছিলেন যাত্রীর। এরই মধ্যে পুলিশ রিকসা আটক করে রাস্তার ধারে উল্টো করে রফিকুল সহ তিনজনকে বসিয়ে রেখেছে।

শামীম বিয়ে সাদী করেনি। বাড়িতে বাবা, মা এবং ছোট্ট বোন আছে। তার দিকে চেয়ে আছেন কখন টাকা পাঠাবে, খাওয়ার কিনবে। ধার- দেনা পরিশোধ করবে। গ্রামে ধার-দেনা হয়তো মিলছে কিন্তু কদিন? টাকা না পাঠাতে পারলে সে ধার-দেনার জায়গাও শেষ হয়ে যাবে। না খেয়ে থাকবে বৃদ্ধ বাবা-মা, ছোট্ট বোন। নিজের ম্যাসের খরচ তো আছেই। আরেক রিকসাওয়ালা বিল্টুর জীবনের গল্প প্রায় একই।

করোনার মহামারীতে সবচেয়ে বেকায়দায় এ সব মানুষ। যে লোকটি কিছু টাকা মোবাইল একাউন্টে জমা রেখে টাকা স্থানান্তরের কাজ করতো সেখান থেকে দিনে কিছু রোজগার হতো। লকডাউনে মানুষের টাকা পাঠানো নেই। তারও ব্যবসা নেই, রোজগার নেই। যে কটাকা পুঁজি ছিল সে টাকা খেয়ে ফেলেও সে কূল কিনারা পাচ্ছে না। অথবা বাজারে যে দোকান করতে আসতো তার বাজারটা বয়ে দিয়ে কিছু টাকা রোজগার করতো। বড় বড় মার্কেটে আসবাবপত্র সহ বিভিন্ন সামগ্রি যে কুলি-মজুর কাজ করতো তাদের এখন কাজ নেই।

গুলিস্তানের বঙ্গবন্ধু এভিনিউ-এর একটি খাবারের দোকানের একটি ঝাপ খোলা রেখে বসে আছে জনা তিনেক মানুষ। তাদের একজন ইসতিয়াক, দোকানের ম্যানেজার তিনি। তিনি জানালেন, খাওয়ার দোকান খাবার বিক্রির জন্য খোলা রেখেছি। তারপরও কত্ত ঝামেলা। আসেপাশের কোন দোকান খোলা নেই। কিছু ইফতারি বানাই, ইফতারির আগে বিক্রি হয়। অন্য সময় লোক নেই বললেই চলে। লকডাউনে কি মানুষ বের হয়! মার্কেট, বিপনি বিতান খোলা থাকলে এর সঙ্গে কত রকমের মানুষের জীবিকা ছিল, করোনায় সব বন্ধ। এ সব মানুষ এখন বাসায় বাসায় লকডাউন খোলা অপেক্ষায়।

করোনা মহামারীর প্রথম আঘাতে দেশে দারিদ্র মানুষের হার বেড়েছিল প্রায় ১৫ শতাংশ। ওই সময়ে অতি দারিদ্র আরও বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ পরীসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে ২০১৯ সালে দেশে দারিদ্র মানুষের হার নেমেছিল ২০ শতাংশে। ২০২০ সালে মার্চ থেকে করোনাভাইরাস মহামারী আকারে ধেয়ে আসতে থাকলে একই বছরের জুন নাগাদ দারিদ্র মানুষের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী ২০১৬ সালে দারিদ্রের হার ছিল সাড়ে ২৪ শতাংশ। ২০১৯ সাল শেষে অনুমিত হিসাবে তা নেমে আসে সাড়ে ২০ শতাংশে। ২০২০ সালের নভেম্বর মাসেই মানুষ কাজে নেমে পড়লে আয়হীন মানুষ আবার আয় করতে শুরু করে। চলতি বছরে মার্চে করোনায় সর্বোচ্চ মৃত্যু ও আক্রান্ত শুরুর প্রেক্ষাপটে কঠোর লকডাউনে মানুষ আবারও কর্মহীন হয়ে পড়ে।

সারা দেশে করোনার ভয়ঙ্কর থাবা মেলেছে। সর্বত্র মানুষের রোজগার কমে যাওয়ায় মানুষ বাজারমুখি হতে পারছে না, ক্রয় ক্ষমতা কমে গেছে। এর ফলে গ্রামের মুরগি বা গরুর খামার থেকে শহরে যে মুরগী বা মুরগীর ডিম, গরু বা গরুর যে দুধ শহরে আসতো তা কমে গেছে। আরও যে সব পণ্য ঢাকায় আসতো সেগুলো পণ্যও ঢাকায় আসছে না। চাউলের উৎসস্থান থেকে যে চাউল আসতো সেখানেও মন্ধার ঘা পড়েছে। এই মন্দার আঘাত লেগেছে গ্রামীণ কর্মসংস্থানেও। ফলে করোনা মহাঘাত সর্বব্যাপি। করোনা বিপর্যন্ত এ সব মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়লেও তাকিয়ে একটু সহায়তার দিকে।

ট্যাগ :