বাংলাদেশ, মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২১ ১২ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম

‘প্রকৃতি কখনোই কারো ঋণ নিজের কাছে রাখে না’-হুমায়ুন, গুলতেকিন ও শাওন এই তিনটি চরিত্রই তার বড় প্রমান


প্রকাশের সময় :২৪ নভেম্বর, ২০১৯ ১১:১৩ : পূর্বাহ্ণ

মোর্শেদ আাকবরী:

সম্প্রতি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আফতাব আহমদকে বিয়ে করেন তিনি। বলা হচ্ছে প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সাবেক স্ত্রী গুলতেকিন খানের কথা। নতুন এই দম্পতির পরিবারসূত্রে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। দুজনের বন্ধুত্ব ছিল দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি ঢাকাতেই ছোট পরিসরে গুলতেকিন-আফতাবের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। সম্প্রতি গুলতেকিনের বিয়ের ব্যাপারটায় আমাকে একটা কথাই বেশি নাড়া দিয়েছে সেটি হলো হিস্ট্রি রিপিটস ইটসেল্ফ। অর্থাৎ প্রকৃতি কখনোই কারো ঋণ নিজের কাছে রাখে না। উপযুক্ত সময়ে সুদে আসলে তা ফিরিয়ে দেয়। যে কঠিন সময়টা গুলতেকিন আহমেদ সিংগেল মাদার হিসেবে নিজের ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা করেছেন, ঠিক এই সময়টাই এখন শাওন পার করছেন।

গুলতেকিন আর হুমায়ূন আহমেদের বয়সের তফাত অনেক বেশি ছিল। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের প্রতি গুলতেকিনের ভালোবাসা ছিল খাঁটি। হুমায়ূন আহমেদ যখন পিএইচডির জন্য আমেরিকায় ছিলেন তখন ভালোবাসার টানেই গুলতেকিন সন্তানসম্ভবা অবস্থাতেই বিদেশে পাড়ি জমায়। সেই সময় গুলতেকিন হয়তো ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী ছিলেন। এ ছাড়া হুমায়ূন আহমেদের আজ নন্দিত কথাসাহিত্যিক হওয়ার পেছনেও গুলতেকিন ওতপ্রোতভাবে জড়িত বিশেষ করে আর্থিকভাবে।

হুমায়ূন আহমেদ তার কোনো একটি গল্পের বইয়ে লিখেছিলেন যে, “পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ খুন হয়। অতি ঘৃণার মানুষ আর অতি ভালোবাসার মানুষ।” গুলতেকিন আহমেদের ক্ষেত্রে হয়তো শেষের উদাহরণটাই বেশি খেটেছিল। কারণ অতি ভালোবাসার মানুষ যখন বিশ্বাসঘাতকতা করে তখন অপরজনের কাছে বাস্তবে না হলেও মনের ভিতর খুন হয়ে যায়। এজন্যই হয়তো বিবাহবিচ্ছেদের পর গুলতেকিন কখনোই হুমায়ূন আহমেদকে নিজের থেকে দেখতে আসেনি এমনকি তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতেও। কারণ হুমায়ূন আহমেদ তো অনেক আগেই গুলতেকিনের কাছে মৃত।

হুমায়ুন আহমেদ তার আরও একটি বইয়ে লিখেছিলেন, ’পুরুষ মানুষ হল বিড়ালের মত, তুমি তাকে যত ভাল খাবারই খাওয়াও না কেন তার চোখ সেই ঝুটা খাবারের দিকেই থাকে।’ নিজের বেলায়ও তিনি তা-ই প্রমাণ করেছেন।

যদিও হুমায়ূন আহমেদ কখনোই গুলতেকিনকে ডিভোর্স দিতে চায়নি তবুও নিজের আত্বসম্মানের কাছে মাথা নত করেনি। কারণ যেখানে নিজের স্বামীকে মেয়ের বান্ধবীর সাথে সম্পর্কে জড়ানোর কথা জানার পরও গুলতেকিন নিজের সংসার ও সন্তানের কথা ভেবে সেই শাওনের পায়ে পর্যন্ত পড়েছে, তবুও শাওন তার কথা শোনেনি, তাই সেই সংসারে থাকার আর কোনো মানেই হয় না। জীবদ্দশায় হয়তো প্রথম ঘরের সন্তানদের সাথে হুমায়ূন আহমেদের ভালো সম্পর্ক ছিল, কিন্তু গুলতেকিন আজীবন নিজেকে হুমায়ূন আহমেদের কাছ থেকে আড়াল রেখেছে। কারণ বিশ্বাসটা হচ্ছে কাগজের মতো। সেই কাগজে যদি একবার ভাঁজ পড়ে যায়, তাহলে সেই ভাঁজ আজীবন থেকে যায়। এই নিয়ে অনেক আক্ষেপ ও অভিমান হুমায়ূন আহমেদের গল্পে ফুটে উঠেছে। যখন হুমায়ূন আহমেদ নিজের নববিবাহিতা দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণে ও সেগুলোর ভ্রমণকাহিনী লিখতে ব্যস্ত, তখন গুলতেকিন নিজের ছেলেমেয়েদের প্রতিষ্ঠিত করতে ও নিজের নিঃসঙ্গ সময়গুলোতে সঙ্গী হিসেবে কবিতা লেখাকে বেছে নিয়ে দিন পার করছিলেন। এজন্যই বলে প্রথম স্ত্রী নিজের স্বামীকে পারফেক্ট করে তোলে, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করে, আর দ্বিতীয় স্ত্রী সবকিছু ভোগ করে।

যাই হোক, সেই কঠিন সময়টা গুলতেকিন অনেকটাই পার করে ফেলেছেন। এখন না আছে সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করার তাড়া, না আছে নিজের নামের পাশে ডিভোর্সি শব্দটি। গুলতেকিন যেমন আগেও গুলতেকিন আহমেদ ছিলেন, এখনো গুলতেকিন আহমেদই হয়েছেন। আর শাওন হয়ে গে ল দ্য ওয়াইফ অব লেট হুমায়ূন আহমেদ।

প্রথমেই বলেছি প্রকৃতি কখনোই নিজের কাছে কোনো ঋণ রাখে না। জীবনটা হচ্ছে অনেকটা প্রতিধ্বনির মতো। তুমি জীবনের সাথে যা করবে ঠিক সেই জিনিসটাই তোমার কাছে ফিরে আসবে। তাই সময়কে সময় দিতে হবে। সময়ই উপযুক্ত জবাব দিবে। যে নিঃসঙ্গতায় একদিন গুলতেকিন আহমেদ ভুগেছিল, ঠিক সেই সময়টাই শাওন এখন হুমায়ূন আহমেদের সেই সাধের পনেরশো স্কয়ার ফিটের দখিনা হাওয়াতে পার করছে এবং সেটা অনেক অল্প বয়সেই।

গুলতেকিন আহমেদের এই সিদ্ধান্তকে হয়তো অনেকেই বাঁকা চোখে দেখছে, কারণ হুমায়ূনরা একাধিক বিয়ে করলেও সবাই বাহবা দেয়, কিন্তু গুলতেকিনরা সেটা করলে ধিক্কার জানায়। তো যাদের এই ব্যাপারে গাত্রদাহ হচ্ছে তারা একবার নিজেদের গুলতেকিন আহমেদের জায়গায় চিন্তা করবেন।

নববিবাহিত দম্পতির জন্য অনেক শুভকামনা রইলো। প্রসঙ্গত,হুমায়ূন আহমেদ ১৯৭৬ সালে গুলতেকিন খানকে বিয়ে করেন। গুলতেকিন প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁর নাতনী। এই দম্পতির তিন মেয়ে এবং এক ছেলে। বড় মেয়ে নোভা আহমেদ, মেজো মেয়ে শীলা আহমেদ এবং ছোট মেয়ে বিপাশা আহমেদ। তার বড় ছেলের নাম নুহাশ হুমায়ুন।

ট্যাগ :