বাংলাদেশ, শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২ ২৮শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

স্বপ্নের পদ্মা সেতুর পর এবার টানেল যুগে প্রবেশের অপেক্ষা


প্রকাশের সময় :২৮ জুন, ২০২২ ৭:২৮ : পূর্বাহ্ণ

এম.এইচ মুরাদঃ

স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালুর পর এবার হাতছানি টানেল যুগে প্রবেশের। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মীয়মান ওই টানেলটি যান চলাচলের জন্য আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে খুলে দেওয়ার কথা। সে অনুযায়ী কাজও এগিয়েছে অনেক দূর। এ প্রকল্পের কাজ প্রায় ৭৫ শতাংশ শেষ হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল প্রকল্পের পরিচালক হারুন উর রশীদ চৌধুরী সোমবার এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ ও চায়নার ৩০০ প্রকৌশলীসহ ১ হাজার কর্মী রাত-দিন কাজ করছে। প্রকল্পের কাজ প্রায় ৭৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।

বর্তমানে টানেলের সঙ্গে সংযোগের জন্য অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ এবং টানেলের অভ্যন্তরে সড়ক নির্মাণের কাজ দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। টানেলের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ইউটিলিটি লাইন স্থাপনের কাজও সম্পন্ন করা হচ্ছে। আশা করছি, ডিসেম্বরের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু টানেল উদ্বোধনের জন্য শতভাগ প্রস্তুত হয়ে যাবে।

তবে কিছু জটিলতার কথাও জানান প্রকল্প পরিচালক। বিশেষ করে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও মালামাল আমদানিতে ছেদ এবং এক্সিম ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থছাড়ের সময় বাড়ানো নিয়ে সমস্যার কথা বলেন তিনি। এ দুই কারণেই সরকার ঘোষিত নির্ধারিত সময়ে স্বপ্নের টানেলটির উদ্বোধন পিছিয়ে যেতে পারে বলেও মনে করছেন তিনি।

তিনি বলেন, করোনার মধ্যে শ্রমিক ও ইঞ্জিনিয়ার সঙ্কটসহ নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে আমরা কাজ করেছি। এখনও কাজ চলছে। তাই ডিসেম্বরের মধ্যেই টানেলের কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু কিছু অসুবিধা দেখা দিয়েছে। চীনের সাংহাই বন্দর ক্লোজড আর এক্সিম ব্যাংকের অ্যাভেইলেবিলিটি পিরিয়ড এক্সটেনশন করা নিয়ে সমস্যা রয়ে গেছে। আমরা আশা করছি, এসবের সমাধান হলে হয়তো টার্গেট অনুযায়ী কাজ শেষ করতে পারব। তবে সব কিছু নির্ভর করছে বিদ্যমান অবস্থা থেকে উত্তরণের ওপর।

প্রকল্পের তথ্যমতে, চীনের অর্থায়নে দেশটির ঠিকাদারের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু টানেলের নির্মাণকাজ চলছে। মূলত চীনের সাংহাই শহর থেকে এ প্রকল্পের অনেক পণ্য ও উপকরণ আমদানি করা হয়। সেখানেই টানেলের মালামাল প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু করোনার বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সাংহাই বন্দর থেকে রফতানি বন্ধ রয়েছে। তাই জাহাজে করে প্রয়োজনীয় মালামাল ও যন্ত্রপাতি আনা যাচ্ছে না, যার প্রভাব পড়েছে টানেলের নির্মাণকাজে।

ইতোমধ্যে প্রকল্পটির ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিসিসিসি) চিঠি দিয়ে প্রকল্প পরিচালকের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেছে। তাদের দাবি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও বিদ্যমান পরিস্থিতির কারণে অগ্রসর হওয়া যাচ্ছে না। সে অনুযায়ী যথাসময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে সংশয় প্রকাশ করে গত ৮ মে সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালকের কাছে চিঠি দিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক।

কাজ ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি সময়মতো শেষ করতে ঠিকাদারকে তাগিদ দেওয়ার কথাও চিঠিতে তুলে ধরেছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। একই চিঠিতে চীনের এক্সিম ব্যাংকের ঋণের টাকা ছাড়করণ নিয়ে সমস্যার কথাও জানানো হয়েছে। অর্থছাড়ের মেয়াদ বাড়াতে বলা হয়েছে। নতুবা প্রকল্পের কাজ প্রভাবিত হবে। দেশটির এক্সিম ব্যাংকের ঋণপ্রাপ্তির সময়কাল আরও ছয় মাস যোগ করে ২০২৩ সালের ৬ মে পর্যন্ত বর্ধিতকরণের কথা জানিয়েছে। এ জন্য সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে দেশটির এক্সিম ব্যাংককে চিঠি দেওয়ার অনুরোধ করেছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।

সূত্র জানায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। চীনের এক্সিম ব্যাংক ২ শতাংশ হার সুদে ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা অর্থায়ন করছে। বাংলাদেশ সরকার ৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকার জোগান দিচ্ছে। ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানেল বোরিং কাজের উদ্বোধন করেন। ২ হাজার ৪৫০ মিটার দৈর্ঘ্যরে প্রথম টানেল টিউবের রিং প্রতিস্থাপনসহ বোরিংয়ের কাজ ২০২০ সালের ২ আগস্ট শেষ হয়েছে। এরপর ওই বছরের ১২ ডিসেম্বর ২ হাজার ৪৫৯ মিটার দৈর্ঘ্যরে দ্বিতীয় টানেল টিউবের বোরিং কাজের উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

২০২১ সালের ৭ অক্টোবর শেষ হয়েছে ওই কাজ। বর্তমানে দ্বিতীয় টিউবের ইন্টারনাল স্ট্রাকচার নির্মাণের কাজ চলমান। ইতোমধ্যে দ্বিতীয় টানেল টিউবের ২ হাজার ৪৫০ মিটার লেন স্ল্যাবের মধ্যে ১ হাজার ৬৮৩ মিটার ঢালাইয়ের কাজ শেষ। দুটি টিউবের তিনটি সংযোগ পথের কাজ চলমান। চীনের জিয়াংশু প্রদেশের জেংজিয়াং শহরে টানেলে সেগমেন্ট কাস্ট প্লান্টে নির্মিত পণ্য চট্টগ্রাম সাইটে এসেছে। প্রকল্পের আনোয়ারা প্রান্তে ৭২৭ মিটার ভায়াডাক্টের কাজ শেষ। চলমান রয়েছে টানেলের পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তে মোট ৫.৩৫ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ রোডের কাজ। টানেলে গাড়ি চলাচল শুরু হলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামগামী গাড়িগুলোকে আর নগরে প্রবেশ করতে হবে না।

ট্যাগ :