বাংলাদেশ, রোববার, ১৭ জানুয়ারী ২০২১ ৩রা মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ফের ঘুরছে শিল্পের চাকা! ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন শ্রমজীবী যোদ্ধারা


প্রকাশের সময় :১৯ জুলাই, ২০২০ ৪:০৫ : অপরাহ্ণ

এম.এইচ মুরাদঃ

করোনাভাইরাস মহামারিতে থমকে যাওয়া শিল্পের চাকা আবার ঘুরা শুরু করেছে। ঘুরে দাঁড়াচ্ছে শ্রমজীবী মানুষ। তারা সংক্রমণ ভীতি পেছনে ফেলে কল-কারখানায় যোগ দেওয়া শুরু করেছেন। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বাজারজাতেও। শিল্প উদ্যোক্তারা এবং ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৩০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনার যে স্কিম আছে তা অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের তাগাদা ছিল, উদ্যোক্তারা আগ্রহী হয়েছেন, এবং তা বিতরণ শুরু করা হয়েছে।

তারা বলেন, করোনায় উদ্যোক্তাদের খুব দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। তারা উৎপাদন করে বিক্রি করতে পারছিলেন না, এখন বিক্রি শুরু হয়েছে। এখন তারা আবার উৎপাদন শুরু করেছেন। ব্যাংক লেনদেন শুরু হয়েছে। তারা হতাশা কাটিয়ে আবার উৎপাদন শুরু করতে শুরু করেছে। মার্চ মাসে সরকার প্রণোদনা ঘোষণা করলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আগ্রহ দেখায়নি। মূল কারণ হলো উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ না থাকা। এ ব্যাপারে শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যেও এক ধরনের প্রতিযোগিতা ছিল প্রণোদনা নেওয়ার।

তারা মনে করেছিল সরকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। ব্যাংকে গেলেই তারা ঋণ পেয়ে যাবে। কিন্তু ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে কৃচ্ছ্রতা অবলম্বন করছিল, উৎপাদন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে ঋণ নিয়ে তারা আদৌ উৎপাদনে যেতে পারবে কি-না। করোনা পরিস্থিতি উন্নতি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছে। ঋণ বিতরণ করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো চাপ অব্যাহত রেখেছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো আগে থেকেই অগ্রগামী।

এ ব্যাপারে পূবালী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, ঋণ বিতরণে এখন আর কোনো প্রলম্বিত নয়। স্টিল, রড, ইলেট্রিক সামগ্রী, সিমেন্টসহ সব ধরনের পণ্য বিক্রি শুরু হয়েছে। কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াজাত শুরু করেছে। মার্চের মাঝামাঝি থেকে জুন পর্যন্ত যে স্থবির অবস্থা ছিল, তা আর এখন নেই। সেই সময়ে যে পণ্য উৎপাদন করে রেখে দিয়েছিল, তা বিক্রি হচ্ছে। ব্যাংকে টাকা আসা শুরু হয়েছে। কল-কারখানার চাকা ঘোরা শুরু হয়েছে। অনেক বড় বড় কারখানার উৎপাদন স্থবির হয়ে গিয়েছিল, থমকে গিয়েছিল। তারা এখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের ঘুরে দাঁড়াতে ব্যাংকের সহায়তা প্রয়োজন হচ্ছে, তা আমরা দেওয়ার চেষ্টা করছি।   

এ বিষয়ে নীট তৈরি পোশাক শিল্পের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আশা করছেন ব্যবসা-বাণিজ্যকে ঘুরে দাঁড়াতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩০ হাজার কোটি টাকার যে সহায়তা স্ক্রিম ঘোষণা করেছেন, শিগগিরই তা পেয়ে যাবেন। ঋণের প্রস্তাবগুলো শাখাতে দেওয়া হয়েছে। সেগুলো হেড অফিস থেকে অনুমোদন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা পাব বলে করছি। তৈরি পোশাক শিল্পে আবার স্পন্দন ফিরে আসছে। টাকার প্রয়োজন। এজন্য ব্যাংকগুলোর সঙ্গেও কাজ বেড়েছে।

ইতোমধ্যে তৈরি শিল্পের বিদেশি ক্রেতারা কার্যাদেশ দিতে শুরু করেছে। উৎপাদিত পণ্য ডেলিভারিও ইতোমধ্যে নিয়েছে। তবে কিছু কিছু কার্যাদেশ বাতিলও হয়েছে। এজন্য ক্রেতারা উদ্বিগ্ন। যেসব প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশ বেশি বাতিল হয়েছে, ফিরে আসেনি এবং ব্যাংকের কাছে থেকে অতীতেও ঋণ গ্রহণ করেনি, সেসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ পেতে সমস্যা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিকেএমইএ নেতা মোহাম্মদ হাতেম। এক্ষেত্রে নীতি সহায়তা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে গত মার্চে সেখানকার বড় ক্রেতারা একের পর এক ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত করে। দেশেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর প্রায় এক মাস পোশাক কারখানা বন্ধ ছিল। এতে কমে যায় রপ্তানি। এপ্রিল মাসেই যার প্রভাব পড়ে। রপ্তানি নামে মাত্র ৩৭  কোটি মার্কিন ডলার, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। মে মাসে কিছুটা বেড়ে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়ায় ১২৩ কোটি ডলারে। জুনে আরও খানিক বাড়ে। রপ্তানি পরিমাণ দাঁড়ায় ২২৫ কোটি ডলারে। বিদায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট ২ হাজার ৭৯৫ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়, যা তার আগের বছরের চেয়ে ৬১৮ কোটি ডলার কম।

এভাবে দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক ঘুরে দাঁড়ায়। তৈরি পোশাক সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জুলাই আগস্ট মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রায় স্বাভাবিক হয়ে যাবে। করোনারভাইরাস আতঙ্কের মধ্যেই এক মাস ধরে দেশের উৎপাদন, বিপণন, যোগাযোগ, সেবা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসের প্রতিরোধে কার্যকর কোনো ওষুধ বা টিকা এখনো আবিষ্কার হয়নি। বাংলাদেশেও কোনো ওষুধ হাতে পায়নি। কিন্তু জীবন-জীবিকার জন্য করোনাভাইরাসের মধ্যেই বের হয়ে পড়েছে মানুষ। উৎপাদন ও বিপণনে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

এ বিষয়ে তৈরি পোশাক খাতের একজন উদ্যোক্তার বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোতে বিক্রয়কেন্দ্র খোলার পরপরই ক্রেতারা ক্রয়াদেশ দিতে শুরু করেছেন। আমাদের কারখানায় গতবারের চেয়ে বর্তমানে ৬০-৭০ শতাংশ ক্রয়াদেশ রয়েছে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ক্রয়াদেশ আছে। তারপরের ক্রয়াদেশও আসছে। তবে আসার গতিটা কম। তৈরি পোশাক কারখানাতে কার্যাদেশ ফিরে আসার সঙ্গে বড় বড় কারখানাগুলো আবার চলা শুরু করেছে। আগের মতোই শ্রমিকরা কারখানায় যাচ্ছেন। কার্যাদেশ কমে যাওয়ার কারণে যেসব কারখানা তাদের সক্ষমতার পুরো ব্যবহার করতে পারছিল না, তারা আবার সক্ষমতার ব্যবহার বাড়াচ্ছে। নতুন করে শ্রমিক নিয়োগ শুরু করেছে।

কারখানা গেটে শ্রমিকরা চাকরির জন্য জড়ো হচ্ছেন। নিয়োগ শুরু করেছে সাব কন্ট্রাক্টনির্ভর কারখানাগুলোতেও। বড় কারখানাগুলোর কাজ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এসব কারখানায় প্রাণের স্পন্দন ফিরে এসেছে। কোনো কোনো কারখানা দ্রুত শিপমেন্ট দেওয়ার জন্য দিন-রাত সমানে কাজ চলছে। এসব কারখানার সামনে গেলে বোঝারই উপায় নেই করোনাভাইরাসের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, খাদ্য আমদানিনির্ভর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো করোনার মধ্যেই পুরোপুরি উৎপাদন ও বিপণন হয়েছে। বরং অন্য সময়ের চেয়ে ভালো ব্যবসা করেছে এসব প্রতিষ্ঠান। করোনাভাইরাসের কারণে লকডাউন অবস্থা আস্তে আস্তে  শিথিল হলেও এসব ব্যবসা-বাণিজ্য উৎপাদন, বিপণন চলমান থেকেছে। করোনাভাইরাসের আঘাতে বিমান চলাচল বন্ধ থাকার কারণে চোরাইপথে মালামাল না আসায় দেশি ইলেকট্রনিক মালামাল বিক্রি বেড়েছে। ইলেকট্রনিক পণ্যের জন্য করোনা যেন আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

ট্যাগ :