বাংলাদেশ, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২০ ২৪শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

প্রস্তাবিত বাজেটের পরিকল্পিত ব্যবহারে করোনা সংকট থেকে উত্তরণের পথ দেখছেন অর্থনীতিবিদরা


প্রকাশের সময় :15 June, 2020 4:55 : AM

এম.এইচ মুরাদঃ

প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থের পরিকল্পিত ব্যবহারে করোনাভাইরাস সংকট থেকে উত্তরণে সুফল ও পথ দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা মনে করছেন, করোনার কারণে জীবন জীবিকা বিপর্যস্ত। চিকিৎসা না পাওয়া আর চিকিৎসা দিতে গিয়ে সংক্রমণের আতঙ্কে সন্ত্রস্ত ডাক্তার রোগী উভয়েই। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাজেটের পরিকল্পিত ব্যবহারে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া এবং তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি।

করোনাভাইরাসের কারণে যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে তাতে স্বাস্থ্য খাতের নাজুক দিকটা বের হয়ে এসেছে। মানুষ আক্রান্ত হয়ে একের পর এক হাসপাতালে দৌড়ালেও ভর্তি হতে পারছেন না। ভর্তি হলেও চিকিৎসা মিলছে না। অক্সিজেনের জন্য হাহাকার। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসা সহায়ক নেই। এ অবস্থায় চিকিৎসক, রোগী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চিকিৎসা না পাওয়ার ভীতি তৈরি হয়েছে। তা দূর করা জরুরি। প্রয়োজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক টেকনিশিয়ান। এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সামগ্রীর সরবরাহে ঘাটতি আছে কিনা সেদিকেও নজর দিতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন, অনুন্নয়ন ব্যয় মিলে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৫ হাজার ৭২৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। উচ্চ বরাদ্দের ক্ষেত্রে ৫ম অবস্থানে উঠে এসেছে স্বাস্থ্য খাত। এর বাইরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের হাতে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে তা ব্যবহার করতে পারবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজেটে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আয় সংকুলান সমস্যা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে না। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন বহুজাতিক অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান অর্থ দিতে প্রস্তুত আছে। দক্ষতার সঙ্গে দুর্নীতিমুক্তভাবে অর্থ ব্যয় করতে পারলে স্বাস্থ্য খাতের জন্য অর্থ সমস্যা হবে না।

এ বিষয়ে পিআরআই-এর নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাজেটে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বা ইচ্ছা করলেই স্বাস্থ্য খাতের জন্য খরচ করা যাবে-এমন বরাদ্দের অভাব হবে না। কিন্তু সমস্যা যেটা হতে পারে তা হলো কোথায় কি করবে তার সঠিক পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়ন ও চিকিৎসকদের নৈতিক শক্তি বৃদ্ধি করা। চিকিৎসার জন্য রাজধানী ঢাকার বাইরে কতগুলো করোনা হাসপাতাল প্রয়োজন, পরিকল্পিতভাবে নিরূপণ করা ও তা দ্রুততার সাথে বাস্তবায়ন করতে হবে। আমাদের চিকিৎসকদের নৈতিক শক্তির অভাব আছে। তারা এতদিন রোগী হিসেবে মানুষকে সেবা করার চেয়ে নিজেদের টাকা রোজগারের মানসিকতা তৈরি করেছেন। তারা এখন মানুষের সেবা দিতে ভয় পাচ্ছেন। সেই সঙ্গে তাদের প্রশিক্ষণের অভাবও রয়েছে। দেশে এখন চীনা প্রশিক্ষক অবস্থান করছেন, তাদের দিয়ে ট্রেইনার প্রস্তুত করা যায়।

বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, কোভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ২০০০ ডাক্তার এবং ৬০০০ নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে ৩৮৬ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, দুই হাজার ৬৫৪ জন ল্যাব এটেন্ডেন্ট ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রাজস্ব খাতে ১২০০ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ৬৫০ মেডিকেল টেকনিশিয়ান এবং ১৫০ কার্ডিওগ্রাফার মিলে সর্বমোট ৩০০০ নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। করোনা মোকাবেলা করতে সরকারের প্রস্তুতি এই প্রস্তাবিত বাজেটে উঠে এসেছে। কিন্তু বাজেটে বরাদ্দ অর্থ সঠিক পথে ব্যয় জরুরি।

স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় পরিকল্পিত ও সঠিকভাবে ব্যবহারের প্রয়োজনীতা রয়েছে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের উন্নয়ন যোগাযোগের সড়ক যোগাযোগের বিপরীত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। সড়ক তাড়াহুড়ো করে নির্মাণ করা হলেও স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে তাড়াহুড়ো করতে গেলে হিতেবিপরীত হয়। দেশের স্বাস্থ্য খাতের যে হাল তারই ফল বলে মনে করেন আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, মেডিকেল কলেজগুলো নৈতিকতার বদলে অনৈতিকভাবে টাকা রোজগারের পথ দেখায়। তারা সরকারি চাকরি করে অথচ মানুষকে সেবা দেয় না। সরকারি হাসপাতাল ব্যবহার করে বেসরকারি ক্লিনিকে টাকা রোজাগার করে। কেনাকাটার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা, যন্ত্রপাতি কেনা হলেও টেকনিশিয়ানের অভাবে যন্ত্রপাতি পড়ে থাকে। বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এসব বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে।

বাজেট বাস্তবায়নে ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিকে কার্যকর ও সজাগ দৃষ্টি রাখার পরামর্শ দিয়েছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র গবেষণা ফেলো তৌফিকুর ইসলাম খান। বাজেটে বরাদ্দ কিসের ভিত্তিতে করা হয়েছে সে বিষয়েও দৃষ্টি দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, বাজেটে বরাদ্দের বিষয়টি পর্যালোচনা সংসদীয় কমিটির এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে। স্বাস্থ্য খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তা পরীক্ষা করে সংসদে বিষয়টি আলোচনা করতে পারে। এটা পরিস্কার করা হলে বাজেটে বরাদ্দ খরচ করার ক্ষেত্রে দুর্নীতি কিছুটা কমবে।

ট্যাগ :