বাংলাদেশ, শনিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২২ ১৫ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম

হাইরাইজ বিল্ডিং করতে গিয়ে ৪ ফুট তলিয়ে গেছে চকবাজার টু বহদ্দারহাট মূল সড়ক! বিল্ডিং মালিকের দাপটে অসহায় সিডিএ


প্রকাশের সময় :১৩ জানুয়ারি, ২০২২ ১১:১৩ : পূর্বাহ্ণ

স্টাফ রিপোর্টারঃ

চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকার কাপাসগোলায় ‘হাইরাইজ বিল্ডিং’ মালিকের দাপটে অসহায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। সিডিএর এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পাঠানো কাজ বন্ধ রাখার নোটিশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আরও অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ করে দিন-রাত সমানতালে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন ভবন মালিক মো. বদিউল আলম ও তার ছেলে মোহাম্মদ এরশাদ।

গত ২ জানুয়ারি ‘হাইরাইজ বিল্ডিং’র নির্মাণকাজ বন্ধ রেখে নকশা জমা দিতে সিডিএর অথরাইজড অফিসার-১ এর দপ্তর থেকে নোটিশ দেওয়া হয় ভবন মালিককে। কিন্তু এরপরও বন্ধ হয়নি কাজ। শুধু দিনে নয়, রাতেও চলছে কাজ।

এছাড়াও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকেও ক্ষতিপূরণ চেয়ে গত ৪ জানুয়ারি একটি নোটিশ দেয়া হয়। এতে ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রায় ৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এবং এই নোটিশে জরিমানা আদায় না করা পর্যন্ত বিল্ডিংয়ের কাজ বন্ধ রাখার আদেশ জারি করা হয়। কিন্তু ভবন মালিক সিডিএ এবং সিটি করপোরেশনের এই সব নোটিশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে দিনে রাতে ভবনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

অভিযোগ উঠেছে সিডিএর কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই ভবন মালিক নির্বিঘ্নে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ভবনটির কাজ করতে গিয়ে চকবাজার থেকে বহদ্দারহাট সড়কের প্রায় ৪ ফুট অংশ মাটির নিচে দেবে গেছে। দেখা দিয়েছে গভীর ফাটল। পরিস্থিতি এমন, যেকোনো সময় ভয়াবহ বিপদ ঘটতে পারে নগরের কাপাসগোলা এলাকায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিডিএর নোটিশকে পাত্তাই দেননি ভবন মালিক। প্রতিদিন চলছে কাজ। সিডিএ পরিদর্শক টিম আসার খবর আগেই চলে আসে ভবন মালিকের কাছে। তখন কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। চলে যাওয়ার পর আবার শুরু হয় কাজ। রাতেও কাজ চলে সমানতালে।

নগরের ব্যস্ততম চকবাজার-বহদ্দারহাট কাপাসগোলা সড়কের তেলিপট্টি মোড় সংলগ্ন আবাসিক হোটেল স্টার পার্ক। এর পাশেই রাস্তার ধারে সিডিএর নীতিমালা অমান্য করে চলছে ব্যক্তি মালিকানাধীন বহুতল ভবনের কাজ। কাজের সুবিধার্থে পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রায় ১৫ ফুট নালা কেটে সেখানে পানির পাইপ সংযুক্ত করে ভবন কর্তৃপক্ষ। অবৈধভাবে নালা কাটার কারণে প্রায় ১০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৫ ফুট প্রশস্ত রাস্তা দেবে যায়।

রাস্তা দেবে যাওয়ার ফলে সরু হয়ে গেছে সড়ক। সাধারণ পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে ওই সড়কে চলাচল করছেন প্রতিনিয়ত। আবার ঝুঁকি নিশ্চিত জেনেও দেবে যাওয়া সড়কে প্রতিদিন যাতায়াত করছে বাস থেকে শুরু করে বিভিন্ন যানবাহন।

জানা গেছে, ভবন মালিক বদিউল আলম ও তার ছেলে মোহাম্মদ এরশাদের যোগসাজশে সিডিএ নীতিমালা উপেক্ষা করে অবৈধভাবে নালা কাটার কারণেই প্রায় ১০০ ফুট দৈর্ঘ্য এবং প্রায় ৫ ফুট প্রশস্থের রাস্তা দেবে গেছে। এছাড়া দেবে যাওয়া সড়ক কৌশলে দখলে নেওয়ার কারণে জনদুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

তবে স্থানীয় ভুক্তভোগীরা জনদুর্ভোগের কারণ হিসেবে দায়ী করছেন সিডিএকে । এ ঘটনায় কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নগরের গুরুত্বপূর্ণ চকবাজার থেকে বহদ্দারহাট সড়কে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষের যাতায়াত। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে বহুতল ভবন নির্মাণ হচ্ছে নির্মাণ বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে। এতে সরকারি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো নজরদারি নেই।

স্থানীয়রা জানান, ভবন মালিক অবৈধভাবে নালা কাটার কারণে সড়ক দেবে গেছে। সরু সড়কে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। ঝুঁকি নিয়ে সরু সড়কে হাঁটতে হচ্ছে পথচারীদের। এতে প্রাণহানির মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে যেকোনো মুহূর্তে। সরকারি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান এলাকার সচেতন মহল।

এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে চাইলে সিডিএর অথরাইজড অফিসার-১ মো. ইলিয়াছ মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে ইমারত পরিদর্শক খোকনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

পরে সিডিএ ইমারত পরিদর্শক খোকনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, নগরের কাপাসগোলা এলাকায় ‘হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের’ কাজে অতিরিক্ত মাটি কাটায় সড়কে কিছুটা ফাটল দেখা দিয়েছে। আমরা পরিদর্শন করে ভবন মালিককে নোটিশ পাঠিয়েছি কাজ বন্ধ রাখতে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভবন মালিকের ছেলে এরশাদ সবকিছু দেখাশোনা করছেন। আমরা তাদের কাজ বন্ধ রাখার জন্য নোটিশ দিয়েছি। এরপরও তারা কাজ চালিয়ে গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে সরেজমিনে গিয়ে ভবন মালিক বদিউল আলমের সাথে সাংবাদিকরা কথা বলতে চাইলে এ সময় তার ছেলে সাংবাদিকদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে নানা রকম অশ্লীল ভাষায় কথা বলতে থাকে। এ সময় এরশাদ সাংবাদিকদের বলেন তার বাবা বদিউল আলম শত কোটি টাকার মালিক। তার বাবার পক্ষে সিডিএ, সিটি করপোরেশন বা প্রসাশনকে ম্যানেজ করা কোন ব্যাপার না। আপনারা যা করার করেন, আমাদের কিছুই হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

চকবাজার ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর রুমকি সেন গুপ্ত এই বিষয়ে বলেন, আল মারজান কনসালটেন্ট ও জায়গার মালিকরা অবৈধ নকশায় কাপাসগোলা সড়কের তেলিপট্টি মোড় সংলগ্ন আবাসিক হোটেল স্টার পার্কের লাগোয়া ব্যক্তি মালিকানাধীন বহুতল একটি ভবনের নির্মাণ কাজ করতে গিয়ে ১০০ ফিট রাস্তা দেবে যায়। তারা কোনো ধরনের সেফটি ব্যবস্থা ছাড়াই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি আমি সিটি করপোরেশন ও সিডিএকে অবহিত করেছি। আমাদের সিটি করপোরেশনের ইঞ্জিনিয়ার দেবে যাওয়া সড়কটি পরিদর্শন করে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ভবন মালিককে ৭ লাখ টাকা জরিমানা করেন। জরিমানা করলেও জরিমানার টাকা দেননি। বড় কথা হচ্ছে, তাঁরা সরকারি দায়িত্বশীল দুটি দপ্তরকে পরোয়ায় করছেন না।

তিনি বলেন, চকবাজার ও বহদ্দারহাট একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। এই সড়ক দিয়ে আমাদের সিটি মেয়র সহ লাখ লাখ মানুষের যাতায়াত। এখন দেবে যাওয়া সড়ক দিয়ে ঝুঁকি থাকা শর্তেও মানুষ ও যানবাহন চলাচল করছে। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভবনা রয়েছে। আমাদের কাজ হচ্ছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ভবন কর্তৃপক্ষকে কাজ বন্ধ রেখে ভবনের নকশা দেখানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এরপরও কাজ চালিয়ে গেলে জনসাধারণকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় প্রতিবাদ করা হবে।

তিনি আরও বলেন, ভবন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটি অপশক্তি হাত মিলিয়ে এসব করার সাহস পাচ্ছে। যাদের ইন্ধনে ভবন কর্তৃপক্ষ সাহস পাচ্ছে, শিগগির জনসম্মুখে তাদের মুখোশ উন্মোচন করা হবে। শেষ কথা হচ্ছে, আমাদের প্রধান কাজ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। (সুত্র :চ,প্র)

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ১৬ নম্বর চকবাজার ওয়ার্ড কাউন্সিলর নুর মোস্তফা টিনু বলেন, হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের কাজে সড়কে ফাটল দেখা দিয়েছে। এই বিষয়ে সর্বপ্রথম এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে আমিই প্রতিবাদ করেছি। আমি এই বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন মাননীয় মেয়র মহোদয়ের সাথে সরাসরি আলাপ করে এবং তাৎক্ষণিক কাজ বন্ধ রাখতে নোটিশ জারি করতে এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করতে অনুরোধ করি। ফলে রাস্তার যে ক্ষতি হয়েছে সেটি দ্রুত মেরামতের জন্য ক্ষতিপূরণ সহ বিল্ডিংয়ে কাজ বন্ধ রাখতে দ্রুত সময়ের মধ্যে নোটিশ জারি করা হয়েছে। অতি অল্প সময়ের মধ্যে আমরা ক্ষতিগ্রস্থ রাস্তাটির মেরামত করতে কাজ শুরু করবো। আর যদি ঐ বিল্ডিংয়ে মালিক নোটিশ প্রাপ্তির পরও তার জবাব না দিয়ে কিংবা জরিমানা আদায় না করে গায়ের জোরে কাজ চালিয়ে যায় তাহলে আমরা সিটি করপোরেশনের আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

ট্যাগ :