বাংলাদেশ, শনিবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২১ ৯ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম

কে দলীয়, কে বিদ্রোহী এটা না দেখে নিরপেক্ষ আচরণের নির্দেশ পুলিশ কমিশনারের


প্রকাশের সময় :১৪ জানুয়ারি, ২০২১ ৭:১০ : অপরাহ্ণ

এম.এইচ মুরাদঃ

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের জন্য মাঠপর্যায়ে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর। বিশেষত প্রার্থীদের দল সমর্থিত বা বিদ্রোহী— এভাবে বিবেচনা না করে সবার প্রতি সমান আচরণ প্রদর্শনের নির্দেশনা দিয়ে নগর পুলিশের এই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, বিষয়টি তিনি মনিটরিং করবেন।

বৃহস্পতিবার (১৪ জানুয়ারি) সকালে সিএমপির মাসিক অপরাধ সভায় এই নির্দেশনা দিয়েছেন কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর।

সভায় উপস্থিত কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, অপরাধ সভায় মূলত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, প্রথমদফা প্রচারণা শুরুর পর গত বছরের মার্চে নগরীর দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের একজন বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থক খুন হওয়া, মঙ্গলবার রাতে পাঠানটুলি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীর এক সমর্থক খুন হওয়া, বিভিন্ন ওয়ার্ডে সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়েই আলোচনা হয়েছে।

সূত্রমতে, সম্প্রতি অভ্যন্তরীণ একটি পুলিশ প্রতিবেদনেও ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে কোন্দল এবং দল সমর্থিত ও বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীদের মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে সংঘাতের আশঙ্কার একটি চিত্র উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, দলীয় কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে অধিকাংশই শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুসারী। আরেক নেতা আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী তুলনামূলকভাবে কম মনোনয়ন পেয়েছে। ২০১৫ সালে জয়ী হওয়া ১৩ জন কাউন্সিলর এবার দলের সমর্থন পাননি। এদের মধ্যে ১৩ নম্বর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের মোহাম্মদ হোসেন হীরণ ছাড়া বাকি ১২ জনই নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের একটিতে সাধারণ কাউন্সিলর পদে একজন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। বাকি ৪০টি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ৮১ জন, যার মধ্যে ১২ জন সদ্যসাবেক কাউন্সিলর। ১৪টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে মহিলা কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী পাঁচ জন, যার মধ্যে চার জনই সদ্যসাবেক কাউন্সিলর। অন্যদিকে ৪০টি সাধারণ ওয়ার্ডে বিএনপির বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীর সংখ্যা পাঁচ জন।

বারবার উদ্যোগ নিয়েও আওয়ামী লীগের অধিকাংশ বিদ্রোহী প্রার্থীকে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করানো যায়নি। এর ফলে দলীয় এবং বিদ্রোহী প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে অন্তর্কলহ জোরদার হওয়ায় সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে প্রভাব পড়ছে। এছাড়া সার্বিকভাবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও মারাত্মক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

সূত্রমতে, অপরাধ সভায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সার্বিক এই চিত্রও তুলে ধরা হয়। এসময় পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার নির্দেশনা দিয়ে মাঠপর্যায়ে কর্মরতদের উদ্দেশে সিএমপি কমিশনার বলেন, ‘আপনারা যারা মাঠে কাজ করেন, আপনাদের অবশ্যই নিরপেক্ষ থাকতে হবে। একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আপনাদের কাছ থেকে নিরপেক্ষ আচরণ আমি প্রত্যাশা করি। কে দলীয় প্রার্থী আর কে বিদ্রোহী প্রার্থী— সেটা আপনাদের বিবেচনা করার দরকার নেই। কোনো প্রার্থীর প্রতি বিন্দুমাত্র প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ নেই। আপনাদের আচরণ আমি নিজে মনিটরিং করব।’

এছাড়া সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে গভীর রাত পর্যন্ত এলাকায় এলাকায় টহল জোরদার থাকবে। চেকপোস্ট বসানো, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান চলবে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ও তাদের গডফাদারদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চলবে। অপরাধ বিভাগের সদস্যদের সঙ্গে নামবে গোয়েন্দা টিমও। এছাড়া উপকমিশনার থেকে ওসি পর্যন্ত কর্মকর্তাদের নির্বাচন পর্যন্ত মাঠে দায়িত্ব পালন করতে হবে। সিএমপি কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিয়মিত বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে তাদের কার্যক্রম মনিটরিং করবেন।

খুন-খারাবির মতো আর একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেন নগরীর কোনো এলাকায় না ঘটে, সেজন্য ওসিদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সূত্রমতে, সভার একপর্যায়ে ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সদীপ ‍কুমার দাশ মঙ্গলবার পাঠানটুলি ওয়ার্ডে নির্বাচনি সহিংসতায় একজন নিহত হওয়া এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে কাউন্সিলর প্রার্থী আবদুল কাদেরসহ ২৬ জনকে আটকের বিষয় সিএমপি কমিশনারের সামনে তুলে ধরেন। তিনি বুধবার নিহত আজগর আলী বাবুলের জানাজাস্থলে শিক্ষা উপমন্ত্রীর মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের আচরণে অপমানবোধ করেছেন এবং কষ্ট পেয়েছেন বলে কমিশনারকে জানান। জবাবে সিএমপি কমিশনার বিষয়টি ‘দেখবেন’ বলে আশ্বস্ত করেন তাকে।

উল্লেখ্য, মঙ্গলবার (১২ জানুয়ারি) রাতে নগরীর ডবলমুরিং থানার মগপুকুর পাড় এলাকায় পাঠানটুলি ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সমর্থিত প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাহাদুর এবং ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী আবদুল কাদেরের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে আজগর আলী বাবুল (৫৫) মারা যান। বুধবার বিকেলে নগরীর আগ্রাবাদে সরকারী কমার্স কলেজের সামনে সড়কে নিহত বাবুলের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

জানাজা শেষে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল কমার্স কলেজের সামনে পৌঁছান। সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় নওফেলের সামনে আসেন ডবলমুরিং থানার ওসি সদীপ কুমার দাশ। তিনি নওফেলের তোপের মুখে পড়েন। ক্ষুব্ধ নওফেল ওসিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘এই এলাকায় বারবার সংঘাত হচ্ছে। একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বারবার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করছে। তাদের বিরুদ্ধে আপনারা (পুলিশ) কী করেছেন? বারবার অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ায় তারা খুনের সাহস দেখিয়েছে। যে অস্ত্র দিয়ে খুন করা হয়েছে, সেটি এখনও উদ্ধার হলো না কেন— আমি জানতে চাই।’

অপরাধ সভার বিষয়ে জানতে চাইলে সিএমপি কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর বলেন, ‘আমাদের মূল ফোকাসটা ছিল সিটি করপোরেশন নির্বাচন। আমি বলেছি যে নির্বাচনে কে প্রার্থী হয়েছেন— এটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। আমি পুলিশের কাছ থেকে সর্বোচ্চ প্রফেশনালিজম চাই। পেশাদারিত্বের বাইরে কেউ প্রভাবিত হয়ে কোনো কর্মকাণ্ড করলে আমি অ্যালাউ করব না। এছাড়া আমাদের পুলিশি কার্যক্রম জোরালো করার একটা সিদ্ধান্ত আমরা নিয়েছি।’

সভায় সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আমেনা বেগম, এস এম মোস্তাক আহমেদ খান ও শ্যামল কুমার নাথসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ছিলেন।

ট্যাগ :