বাংলাদেশ, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২০ ২৪শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

করোনা নমুনা পরীক্ষায় ফল পেতে দীর্ঘসূত্রতা! সারাদেশে সাধারণ রোগীদের ভোগান্তি


প্রকাশের সময় :17 June, 2020 3:48 : AM

এম.এইচ মুরাদঃ

করোনা পরীক্ষার ফল পেতে ভোগান্তি ও দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ উঠছে সারা দেশজুড়ে। বিভিন্ন ল্যাবে প্রতিদিন শত শত লোক নমুনা দিচ্ছেন। এতে ফল প্রকাশে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে ল্যাব কর্তৃপক্ষ। ফল পেতে কয়েক দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ফলে অনেকে পজিটিভ বা নেগেটিভ জানার আগেই মারা যাচ্ছেন বা সুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। আবার একই ব্যক্তির নমুনায় পৃথক ফলও আসছে, একবার আসছে পজিটিভ আবার অন্য জায়গা থেকে করালে আসছে নেগেটিভ বা অনেক সময় শুধু সিরিয়াল দিছে কিন্তু নমুনা দেয়নি সেখানেও ফলাফল আসছে পজিটিভ। স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, টেকনোলজিস্টসহ পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে ফল প্রকাশে বিলম্ব ঘটছে বা এইরকম অস্বাভাবিক কিছু হচ্ছে। তবে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি উন্নয়নের চেষ্টা অব্যাহত আছে। আর স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত রিপোর্ট না দিলে সংক্রমণের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয় শহর চট্টগ্রাম বা শিল্পশহরের বিভিন্ন হাসপাতালে এ চিত্র দেখা গেছে।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, নমুনা দিতে পারলেও রিপোর্ট মিলছে ৩ থেকে ৭ দিন পর। অনেক ক্ষেত্রে এর চেয়েও অনেক দেরি হচ্ছে ১০ থেকে ১২ দিন পর্যন্ত। দ্রুত ফল না পাওয়ায় তারা চিকিৎসা করাতে পারছেন না। আবার ফল পাওয়ার ২-৩ দিন আগেই মারা যাচ্ছেন রোগী। অনেকেই আবার ফল পাওয়ার আগে করোনা উপসর্গ বুঝতে পেরে নিজ দায়িত্বে চিকিৎসা করে সুস্থও হয়ে উঠছেন।

চট্টগ্রামের ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকসাস ডিজিজ (বিআইটিআইডি) হাসপাতালের ল্যাবরেটরিতে নমুনার স্তূপ জমা হচ্ছে। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার নমুনা এই ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। চট্টগ্রামে ফল পেতে লেগে যাচ্ছে সাত থেকে ১০ দিন বা অনেক সময় আরও বেশি।

বান্দরবানের থানচি উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার মো. মাহফুজুল হক বলেন, গত ২২ মে নমুনা দিয়েছিলাম। দীর্ঘ ২২ দিন পর পরীক্ষার ফলাফলে পজিটিভ এসেছে। এটি এক রকমের সীমাহীন ভোগান্তি।

চট্টগ্রামের পটিয়ার সরকারি সাস্হ্য কমপ্লেক্সে মোঃ মোরশেদুল হক আকবরী করোনা পরিক্ষার নমুনা দিয়েছেন প্রায় ১২ দিন আগে কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোন রিপোর্ট পাননি। ওনি জানান ওনার করোনা পরিক্ষার সিরিয়াল দিতে লেগেছিল আরো ৭ দিন। মোট ১৯ দিন পরও তিনি এখনও জানতে পারে নাই ওনার রিপোর্ট পজিটিভ নাকি নেগেটিভ। তিনিও নিজ দায়িত্বে চিকিৎসা করে এখন মোটামুটি সুস্থ আছেন।

গাজীপুর, খুলনা, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন শহরের চিত্র প্রায় এক। জটের কারণে সংশ্লিষ্ট ল্যাবগুলো পাঁচ থেকে ছয়দিন আগের সংগৃহীত 
নমুনা পরীক্ষা চলছে। দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে অনেকে হারিয়ে যাচ্ছেন চিরতরে।

রিপোর্ট পাওয়া নিয়ে এত দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে চট্টগ্রাম বিআইটিআইডি হাসপাতাল ল্যাবের সমন্বয়কারী ডা. শাকিল আহমেদ বলেন, ‘ল্যাবে নমুনাজট লেগেছে। সংগৃহীত নমুনা অনুযায়ী জনবল পেলে তা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশ করা সম্ভব।’

বিভিন্ন জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কর্মকর্তারা এক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা ও ভোগান্তির কথা স্বীকার করেছেন। তারা বলেন, দ্রুত ফল হাতে না পাওয়ায় অনেকে হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছেন না। যখন শ্বাসকষ্ট শুরু হয় তখন হয়তো আক্রান্ত ব্যক্তি সংকটাপন্ন পর্যায়ে চলে যান। এই সময় ভর্তি হতে চাইলেও বেসরকারি হাসপাতালগুলো ভর্তি নিচ্ছে না। সরকারি হাসপাতালে করোনা রোগীর শয্যা খালি নেই। এছাড়া হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন সংকট তো রয়েছেই। এতে মৃত্যু বাড়ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং সরকার সাস্হ্যখাতে এইসব সমস্যাগুলো সমাধানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট আন্তরিক হলেও কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর গাফিলতির কারনেও অনেকটা দুর্ভোগ বেড়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভুক্তভোগিরা বলছেন, এক-দেড় সপ্তাহ পর ফল আসে তাহলে রোগীসহ ওই পরিবার দিনগুলো কতটা আতঙ্কে কাটিয়েছেন, তা শুধু ভুক্তভোগীরা বোঝেন। রিপোর্ট না আসায় পরিপূর্ণ চিকিৎসা নিতে পারছে না, অন্যদিকে তার দ্বারা পরিবারের অন্যরাও সংক্রমিত হচ্ছে।

জানা গেছে, অনেকে যোগাযোগ করে দিনে দিনেই পরীক্ষা করাতে পারছেন। অল্প সময়ে পরীক্ষার ফলও জানতে পারছেন। আইইডিসিআরের একটি সূত্র জানায়, প্রভাবশালীদের অনুরোধ রাখতে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ ও ফল জানাতে ও জটিলতা কিছুটা বাড়ছে। জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ের ল্যাবগুলোতেও প্রভাবশালীদের তদবির অব্যাহত আছে। তারা দিনের দিন ফল পেয়ে যাচ্ছেন। এতে উপেক্ষিত হচ্ছেন সাধারণ রোগী।

এদিকে দেশে করোনা সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে নমুনা পরীক্ষায় ভুল ফলের সংখ্যা। একই নমুনা কখনো পজিটিভ আসছে, কখনো আসছে নেগেটিভ। নমুনার মান নিয়েও অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে। অর্থাৎ নমুনা সংগ্রহ, নমুনা পাত্রজাত করা এবং নমুনা পাঠানোর ক্ষেত্রে ত্রুটি থাকছে। কয়েকটি ল্যাবরেটরি সূত্র জানায়, লালা সংগ্রহের সময় সব ক্ষেত্রে সোয়াব স্টিক ব্যবহার করা হচ্ছে না। লালা রাখার পর পাত্রের মুখ ঠিকমতো আটকানো হচ্ছে না। এমন নমুনা পরীক্ষা করা যাচ্ছে না। বাদ দিতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, সঠিক প্রক্রিয়ায় নমুনা সংগ্রহ করা না হলে ভুল ফল আসতে পারে। নমুনা সংগ্রহে দক্ষ ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টের অভাবও ভুল রিপোর্টের জন্য দায়ী।

গতকাল স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, ৫৮টি ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৫ হাজার ৭৩৩ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরীক্ষা করা হয় ১৫ হাজার ৩৮টি। এর মধ্যে শনাক্ত হয়েছেন আরও তিন হাজার ৯৯ জন। এ নিয়ে দেশে মোট নমুনা পরীক্ষা করা হলো পাঁচ লাখ ১৬ হাজার ৫০৩টি।

সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক টেকনোলজিস্ট নেই। ফলে এ সংকট বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুযায়ী, একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স এবং পাঁচজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট থাকার কথা। সে হিসেবে গত ২১ মার্চের হিসাব অনুযায়ী, দেশে টেকনোলজিস্টের পদ থাকার কথা এক লাখ ২৮ হাজার ৭৫টি। কিন্তু বর্তমানে কর্মরত মাত্র পাঁচ হাজার ১৮৪ টেকনোলজিস্ট।

ট্যাগ :