বাংলাদেশ, বৃহস্পতিবার, ২২ এপ্রিল ২০২১ ৯ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

ঢেলে সাজানো হচ্ছে হাসপাতাল-ক্লিনিক নীতিমালা! বাড়ছে নজরদারিও


প্রকাশের সময় :২২ জুলাই, ২০২০ ৪:৩৬ : অপরাহ্ণ

স্টাফ রিপোর্টারঃ

অনিয়ম-দুর্নীতিতে নিমজ্জিত স্বাস্থ্য খাত। রুগ্নভগ্ন এ খাতকে ঢেলে সাজাতে জোর প্রচেষ্টা শুরু করেছে সরকার। ইতোমধ্যে রিজেন্ট, সাহাবুদ্দিনসহ কমপক্ষে ১০টি হাসপাতালের অনিয়ম খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণও চলমান। এখন সারা দেশের সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতাল-ক্লিনিকে কঠোর নজরদারি শুরু করেছে সরকার। গত মঙ্গলবার দেশের সব সিভিল সার্জনকে একটি করে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সুধী মহল ও সাধারণ মানুষ। তারা বলছেন, এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হোক। তবে পেছনে থাকা রাঘববোয়ালরা যেন পার না পায়।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে ১৫ হাজারের মতো বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ১৬৪টির লাইসেন্স আছে এবং এই লাইসেন্সধারীদেরও মাত্র ২ হাজার হাসপাতাল ও ক্লিনিক লাইসেন্স নবায়ন করেছে।

মহামারি করোনাকালে অনিয়ম-দুর্নীতির স্বরূপ উন্মোচিত হয়। প্রকাশ্যে আসে কীভাবে এই সেবা খাতে হরিলুট চলছিল। অভিযোগের আঙুল ওঠে স্বয়ং স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের দিকে। দায় নিয়ে গত মঙ্গলবারই তিনি পদত্যাগ করেন। পদত্যাগ ছাড়া তার কোনো পথও ছিল না। পদত্যাগ করে তিনি মান বাঁচিয়েছেন মাত্র। বুধবার অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো) ডা. আমিনুল হাসানকেও অব্যাহতির সিদ্ধান্ত হয়।

বিশ্লেকরা বলছেন, এসব অনিয়মের সঙ্গে আরও রাঘববোয়াল জড়িত। তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। তারা যেন পার না পায়। সরকার একটি ভালো কাজ করতে গেলে তা বন্ধে নানা তদবির শুরু হয়। এবারও এমনটি যেন না হয়। ভুক্তভোগী অনেকে বলছেন, অভিযোগের তীর স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দিকেও রয়েছে। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও উঠেছে। সরকারের উচিত, বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণভাবে দেখা। দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা।

এ বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, লাইসেন্স ছাড়াই বহু হাসপাতাল-ক্লিনিক চলছে। স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটা এবং চিকিৎসায় অনিয়ম একটা প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা পেয়েছে। এটা হতে পারে না। এখন দৃশ্যমান কিছু ঘটনায় সরাসরি জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু পেছনের রুই-কাতলাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে দীর্ঘমেয়াদে কোনো ফল হবে না। তিনি বলেন, এ ধরনের দুর্নীতি এক হাতে হয় না। এটা ‘উইন-উইন গেম’। এখানে সাধারণত তিনটি পক্ষ থাকে। ঠিকাদারি বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নামে প্রতারক চক্র আছে। তাদের সুরক্ষা দেয় প্রশাসনের একাংশ, যারা কাগজপত্র প্রক্রিয়াজাত করে। তার সঙ্গে যুক্ত হয় আরও উচ্চতর প্রভাবশালী মহল। এর বিভিন্ন দৃষ্টান্ত প্রকাশ পাচ্ছে। সেখানে রুই-কাতলাদের না ধরে নিচের দিকের ব্যবস্থা নিয়ে ইতিবাচক কিছু হবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক ড. শাহনাজ হুদা বলেন, মন্ত্রণালয়ের একটা সিন্ডিকেট আছে। যেটা সবাই বলছে। অবশ্যই তাদের উচ্চপর্যায়ের অনেকের সঙ্গে কানেকশন আছে এবং এটা যদি আমরা না ধরতে পারি, তাহলে স্বাস্থ্যখাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে না।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি এবং সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক বলেন, অনিয়ম-দুর্নীতির পেছনের শক্তিকে চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তিনি আরও বলেছেন, যেহেতু প্রধানমন্ত্রী এখন প্রতিদিন এগুলোর ফলো-আপ করছেন। সুতরাং তিনি ব্যবস্থা নেবেন বলে আমি বিশ্বাস করি। দুদক সচিব দিলওয়ার বখত বলেন, স্বাস্থ্যখাতে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের ব্যাপারে দুদক যে অনুসন্ধান করছে, তাতে আদালতে প্রমাণযোগ্য তথ্য যা পাবে, তার ওপর ভিত্তি করে দুদক এগুবে।

সার্বিক বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুল মান্নান বলেন, সব হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্সসহ সংশ্লিষ্ট সব বিষয় তদারকির জন্য জেলায় জেলায় সিভিল সার্জনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার সিভিল সার্জনদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। গ্রামপর্যায় পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক নয়, সারা দেশেই উপজেলা পর্যায়ের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক বা অবৈধভাবে স্বাস্থ্যখাতে অনেক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে। প্রত্যেকটি জায়গায় আমরা খোঁজ-খবর নেব এবং নজরদারিতে আনব।

শুরুটা হয় করোনাভাইরাস পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে। জেকেজি নামের সেবাপ্রতিষ্ঠান, রিজেন্ট হাসপাতাল ও সাহাবুদ্দিন হাসপাতাল সরকারের নাকের ডগায় বসে প্রতারণা করে আসছিল। সরকার এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আসা অনিয়ম ক্ষতিয়ে দেখছে। নানা ব্যবস্থাও নিচ্ছে। জেকেজি হেলথ কেয়ার এবং রিজেন্ট হাসপাতালের কেলেঙ্কারির প্রেক্ষাপটে অনেক বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিকের লাইসেন্স না থাকার অভিযোগও সামনে এসেছে। এরপর স্বাস্থ্য অধিদফতর এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঢাকায় এক সপ্তাহে ১০টি বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিকে অভিযান চালিয়ে বেশিরভাগেরই লাইসেন্স নবায়ন না করা এবং নানা অনিয়মের তথ্যপ্রমাণ পায়। স্বাস্থ্যখাতের পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার মুখে সরকারের পক্ষ থেকে চিকিৎসায় প্রতারণা ঠেকাতে সারা দেশে নজরদারির ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

ট্যাগ :