বাংলাদেশ, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২০ ২৬শে চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

এখন সময় সবার একা থাকার


প্রকাশের সময় :23 March, 2020 1:53 : PM

এম.এইচ মুরাদঃ

‘একা হয়ে যাও সব সঙ্গ থেকে, উন্মাদনা থেকে, আকাশের সর্বশেষ উদাস পাখির মতো, নির্জন নিস্তব্ধ মৌন পাহাড়ের মতো একা হয়ে যাও। এত দূরে যাও যাতে কারো ডাক না পৌঁছে সেখানে, অথবা তোমার ডাক কেউ শুনতে না পায় কখনো।’

মহাদেব সাহার এ একা হয়ে যাও কবিতার কথাই এখন সর্বত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে। করোনা ভাইরাসসৃষ্ট মহামারির প্রভাবে গোটা দেশের মানুষকেই এখন একা হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। বলা হচ্ছে, আপনি বাঁচলে দেশ বাঁচবে আর দেশ বাঁচলে আপনি বাঁচবেন। অথচ এন্থনি ফন লিউয়েনহুক যখন আজ থেকে সাড়ে তিনশ’বছর আগে আতশি কাচের নিচে কিলবিল করা প্রাণগুলোকে দেখতে পেলেন, তখনো তিনি জানতেন এক নতুন দুনিয়ার সন্ধান পেয়ে গেছেন।

তিনিই প্রথম আণুবীক্ষণিক প্রাণের দুনিয়াকে মানুষের সামনে উন্মোচিত করেন, ওই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণগুলোর নাম দেন ‘এনিম্যালকুলস’। ইতিহাসের শুরু থেকেই মানুষ এই অণুজীবদের আক্রমণের শিকার হয়েছে, প্রাণ হারিয়েছে কোটিতে কোটিতে, অথচ কারা এ প্রাণহানির কারণ তা মানুষের বুঝে উঠতে লেগেছে লক্ষ লক্ষ বছর। ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া আবিষ্কারেরও বেশ কিছু সময় পর, রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস সম্পর্কে মাত্র মানুষ জানতে শুরু করে ঊনবিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষভাগে।

কয়েকশ’বছর আগেও এ বিপর্যয় সৃষ্টিকারী মহামারিগুলোর কারণ হিসেবে অণুজীবকে কল্পনা করা দুরূহ ছিল। বিভিন্ন দেব-দেবীর কর্মকাণ্ড বা মানুষের পাপের শাস্তি ইত্যাদিকে অণুজীবসৃষ্ট মহামারির কারণ হিসেবে কল্পনা করা হত। কিছুদিন আগেও আমাদের দেশের মানুষ কলেরার কারণ হিসেবে কাল্পনিক ‘ওলা বিবিকেই চিহ্নিত করত, জহির রায়হানের ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসে যার উল্লেখ আমরা পাই।

মানুষ কারণ সম্পর্কে জানুক আর না জানুক, ইতিহাসে এ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুজীবসৃষ্ট মহামারির প্রভাবে সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে, পাল্টে গেছে আমাদের সমাজ সংগঠন ও অর্থনীতির চিত্র। কিন্তু বাঙালি সব সংকট ঠিকই কাটিয়ে উঠেছে।

এখন পর্যন্ত বাঙালি ঐক্যবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল হয়েই সব সংকট জয় করেছে কিন্তু প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস এখন ঐক্যের বিপরীতে সঙ্গনিরোধের কথা বলছে। কী জিনিস এই সঙ্গনিরোধ? সঙ্গনিরোধের ইংরেজি কোয়ারেন্টাইন। বলা হচ্ছে বালাই অথবা রোগ বিস্তারকে প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে দ্রব্যাদি এবং মানুষের মুক্তভাবে চলাচলের ওপর আরোপিত বিধি-নিষেধই এই সঙ্গনিরোধ।

যদি কারো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে এবং নিশ্চিতভাবে তাকে মেডিক্যাল ডায়াগনোসিস করার সুযোগ না থাকে, তখন রোগ এবং অসুস্থতা নিয়ে আলোচনা করার পাশাপাশি তাকে বা তাদেরকে সঙ্গনিরোধ অবস্থায় রাখা হয়। সঙ্গনিরোধ মেডিক্যাল পৃথকীকরণের সমার্থক শব্দ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। সুস্থ জনগোষ্ঠী থেকে আক্রান্ত এবং সংক্রমিত ব্যক্তিকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা করে রাখার নামই পৃথকীকরণ। সঙ্গনিরোধকে কর্ডন স্যানিটায়ারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

এ দুই শব্দপুঞ্জই একে অপরের কাছাকাছি; তবে কর্ডন স্যানিটায়ার বলতে সুনির্দিষ্টভাবে বোঝানো হয় সংক্রমণজনিত রোগ ছড়ানো আটকে দেওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার মানুষজনের চলাচলকে বাধা দেওয়া। কিন্তু আমরা আসলে এ সঙ্গনিরোধ বা হোম কোয়ারেন্টাইনের জন্য কতটা প্রস্তুত? সংক্রামক ব্যাধির কোয়ারেন্টাইন কি জিনিস তা আমাদের সকলেরই বুঝতে হবে। সংক্রমণ রোধে যেখানে এ হোম কোয়ারেন্টাইন গড়ে তোলা হবে সেখানে কিন্তু সব ধরনের আধুনিক ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোয়ারেন্টাইন হবে সম্পূর্ণরূপে ডাস্ট-ফ্রি।

প্রত্যেক রোগীর জন্য আলাদা রুম এবং আলাদা বাথরুম লাগবে। এই যে হোম কোয়ারেন্টাইনের সম্পর্কে একটা ধোঁয়াটে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে তা কিন্তু অনেকের কাছেই পরিষ্কার নয়। অথচ এটা একদম স্বচ্ছ ধোঁয়া। এই ধোঁয়া করোনার মতোই প্রথম ছোঁয়ায় নাও বুঝতে পারেন। বুঝবেন কেবল চোখে ঝাঁঝটা বেশি করে লাগলে। আচ্ছা বলুন দেখি, এমন কোনো বাঙালি মা আছেন, যিনি তার সন্তানকে অসুস্থ দেখলে তার কাছে যাবেন না, মাথায় হাত বোলাবেন না, পিপাসায় অসুস্থ সন্তানকে পানি এগিয়ে দেবেন না? ঐ মায়ের কি বিশেষায়িত নার্সিং প্রশিক্ষণ আছে?

একজন বাবা হিসেবে ভাবুন তো আপনার অসুস্থ শিশুটিকে আইসোলেট করে দিতে পারবেন কিনা? আইসোলেট মানে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। একটি আলাদা রুমে পুরোদস্তর বন্দি করে রাখতে হবে। চোখ ঢাকা চশমা, পুরো মুখাবয়ব ঢাকা মাস্ক এবং বায়োসেফটি গাউন পরে তার কাছে যেতে হবে। ক্ষেত্রবিশেষে রোগীকেও এই পোশাকে ঢাকতে হতে পারে।

পুরো শরীর আবৃত না থাকলে রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস এলাকার কাছেও ঘেষা যাবে না। খাবার-দাবার এবং রোগীর (কিংবা সম্ভাব্য রোগীর) প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র অনেকটা দূর থেকে ঠেলে দিতে হবে। কিছু স্পর্শ করা যাবে না হাত ধোয়ার আগে নিজের চোখ-মুখ পর্যন্ত স্পর্শ করা যাবে না। কারও সঙ্গে হাত মেলানো নয়, শিশুদের আদর করা নয়। আমার মাস্ক অন্য কেউ ছোঁবে না, স্টেরিলাইজ নিশ্চিত না হলে ব্যবহৃত মাস্ক কোথাও রাখাও যাবে না। ভুল করে কোথাও রাখলে সেই স্থানটিও সেনিটাইজার (টক, ডিটারজেন্ট, স্পিরিট বা এলকোহলযুক্ত পানি) দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।

বাসায় কোয়ারেন্টাইন বানিয়ে এরকম সতর্কতা কি সম্ভব? আপনি না হয় সতর্ক হলেন। আপনার বাসার মধ্যে ধুপধাপ করে হেঁটে বেড়ানো দুই বছরের শিশুটিকে কীভাবে সতর্ক করবেন? ঐ বাবুটি যে অসুস্থ মায়ের, বাবার বা দাদা-দিদিমার বিছানায় উঠে পড়বে! আপনার গ্রামের বাড়িতে প্রত্যেকের জন্য আলাদা এটাচড বাথরুম আছে? কোয়ারেন্টাইনের রোগীকে কোন বাথরুম ব্যবহার করতে দেবেন? সম্পূর্ণ মেডিকেটেড ব্যবস্থাপনা ছাড়া কোয়ারেন্টাইন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

শুধু মেডিকেটেড আয়োজন নয় অতিমাত্রায় কঠোরতা আরোপ ছাড়া মেডিকেটেড অবকাঠামোর মধ্যেও এর বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এ কঠোরতা হয়ত নিষ্ঠুরতার পর্যায়ে পড়বে। মায়ের কোল থেকে শিশুকে কেড়ে নিয়ে কোয়ারেন্টাইন করতে হবে। কারণ মায়ের আবেগ দিয়ে শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব নয়। আবেগ প্রশ্রয় দিলে মাকেও বাঁচানো সম্ভব নয়। ছেলে মারা গেছে বলে লাশের ওপর উথালি-পাথালি কান্নার সুযোগ দেওয়া যাবে না। প্রচলিত পদ্ধতিতে লাশ গোসল দেওয়াও হয়ত সম্ভব হবে না।

বাস্তবতা মানতে হবে। চরম কষ্ট বুকে চেপে চোখের জলকে পাথর বানাতে হবে। কারণ মানুষকে বাঁচাতে হবে। দুর্যোগের প্রস্তুতি এরকমই হওয়া উচিত। মনে করুন, আপনি যুদ্ধের মধ্যে আছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশ এবং মানুষকে বাঁচানোর দায়িত্ব আপনার ওপর। দেশ এবং মানুষকে প্রচ- ভালোবেসেই আপনাকে নিষ্ঠুর হতে হবে। একাধারে একজন সৈনিকের ভালোবাসা এবং সৈনিকের মতো অকাতর নিষ্ঠুরতা কিছু কিছু সময় আসে যখন এরকম প্রস্তুতি নিতে হয়। আমাদের সামনের সময়টা সেরকমই হতে পারে।

চীন যে করোনা নিয়ন্ত্রণে বেশি সাফল্য পেয়েছে, তার প্রধান কারণ এই কঠোরতা। সেখানেও এই রোগ যত দূর ছড়িয়েছে তার পুরোটাই ছড়িয়েছে কঠোরতার ফাঁকফোকর গলে। যত বেশি সাবধানতা হবেন, এ ভাইরাসের হাত থেকে তত বেশি নিরাপদ হবেন। পাশাপাশি সেখানকার ডাক্তার নার্সরা তাদের রোগীদের সেবাদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

তাদেরও দেওয়া হয়েছিল সর্বোচ্চ নিরাপত্তা আর এখন দেওয়া হচ্ছে বীরের মর্যাদা। অথচ আমাদের দেশে যেসব ডাক্তার এবং নার্সরা করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিকে সেবা দেবেন বা দিচ্ছেন তাদের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক বায়োসেফটি গাউনও এখন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।

তারা অরক্ষিত অবস্থায় রোগী বা সম্ভাব্য রোগীদের কাছে যাবেন কি? কী একটা তামাশা! এ ক্ষেত্রে অনেক সময় ডাক্তার এবং নার্সদেরও কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হয়। ইতোমধ্যে ঢাকা মেডিকেলের চারজন ডাক্তারকে কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে। এজন্য তাদের ভিন্ন বাসস্থান দরকার। নইলে তাদের পরিবার এবং পরিচিতজনরাও আক্রান্ত হতে পারে। তার জন্য কি ব্যবস্থা হয়েছে? তবুও আমাদের দেশের ডাক্তাররা হাজারো সীমাবদ্ধতার ভেতরেও হাসিমুখে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

এটাই বাঙালির বড় শক্তির জায়গা। করোনা ভাইরাস পৃথিবীজুড়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বর্তমান সময়ে আমাদের মাথার ওপর ভর করে আছে এক পাহাড় সমান সঙ্কট।

মনে রাখতে হবে, মহামারি প্রতিরোধে শুধু বিজ্ঞানীদের কাজ করলেই চলে না, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের এ মহামারি ঠেকাতে উপযুক্ত উদ্যোগ নিতে হয়। সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হয়, রোগ প্রতিরোধ সম্পর্কে সাধারণ ধারণা দিতে হয়। এক্সপার্টদের জ্ঞানকে মাঠপর্যায়ে কাজে লাগাতে হয়।

রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে লড়াই করতে হয় মহামারির বিরুদ্ধে। পাশাপাশি আতঙ্ক না ছড়িয়ে করোনা ভাইরাসের সম্ভাব্য সংক্রমণের আশঙ্কা সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করা, প্রচারমাধ্যম ব্যবহার করে এ সম্ভাব্য সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কী ভূমিকা থাকতে পারে সেই বিষয়ে ব্যাপক প্রচার করা দরকার।

জীবনের এ কঠিনতম মুহূর্তে যারা তাদের আশার সঙ্গে আপস করে না তারাই বিজয়ী। আশা রাখছি, এ সংকট মোকাবেলায় আমরা বিজয়ী হব ইনশাআল্লাহ।

ট্যাগ :