বাংলাদেশ, শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১ ৭ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ


প্রকাশের সময় :৩০ আগস্ট, ২০২১ ৬:১৪ : পূর্বাহ্ণ

তপন কান্তি ধরঃ

লীলা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ আবির্ভাব তিথি শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সবাইকে প্রীতি ও শুভেচ্ছা। প্রতি বছর এই তিথি আমাদের সকলের জন্য শুভ ও কল্যাণের বার্তা নিয়ে আসে। গতবারের মতো এবারও বিশ্বব্যাপী করোনার প্রভাব থেকে মুক্তির জন্য মানুষের প্রার্থনা আর হাহাকারের মধ্যে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা শুভ জন্মাষ্টমী উৎসব পালন করছে। ভগবানের কাছে আমরা প্রার্থনা করি, তিনি যেন পৃথিবীর মানুষকে এই মহামারী থেকে পরিত্রাণ দেন। এ পৃথিবী যেন আবার আগের মতো কর্মচঞ্চল ও প্রাণমুখর হয়ে ওঠে।

ভগবদ্গীতায় (৪/৭-৮) শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ‘যখনই ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মের অভ্যুত্থান হয় তখনই আমি নিজেকে প্রকাশ করে অবতীর্ণ হই। সাধুদের পরিত্রাণ করার জন্য, দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ করার জন্য এবং ধর্ম সংস্থাপনের উদ্দেশ্যে আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।’ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পরমেশ্বর হওয়া সত্ত্বেও মানুষের মতো তাঁকে পৃথিবীতে অবস্থান করতে হয়। যদিও তিনি লোকশিক্ষার আদর্শবাহী অনেক কাজ করেন, তবুও অনেকেই তাঁকে পরমেশ্বর বলে মেনে নিতে দ্বিধা করেন। ভগবানের পূর্ণতা নিয়েও প্রশ্ন করেন। বৈদিক শাস্ত্রে বলা হয়েছে, লীলা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ষোড়শ কলাগুণে পরিপূর্ণ। অনিমা, মহিমা, প্রাপ্তি, প্রাকাম্য, লঘিমা, ঈশিতা, কামবসায়িতা ও বশিতা- এই আট যোগসিদ্ধি; লীলা ও কৃপা ছাড়াও ছয়টি ঐশ্বর্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে রয়েছে। শাস্ত্রে রয়েছে ‘সমগ্র ঐশ্বর্য, সমগ্র বীর্য, সমগ্র যশ, সমগ্র সৌন্দর্য, সমগ্র জ্ঞান ও সমগ্র বৈরাগ্য- এই ছয়টির সমাহারকে ‘ভগ’ বলে। এই ছয়টি অচিন্ত্যগুণ যাঁর মধ্যে অঙ্গাঙ্গীভাবে পূর্ণরূপে রয়েছে তিনিই ভগবান।’ একমাত্র শ্রীকৃষ্ণের মধ্যেই এই ষড়ৈশ্বর্য পূর্ণরূপে বিরাজমান। তাই তিনি এবং বিষ্ণুতত্ত্বরূপে তাঁর বিস্তারসমূহই ভগবৎ পদবাচ্য। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় (৪/৯) বলেছেন, জন্ম কর্ম চ মে দিব্যম্ অর্থাৎ ‘আমার জন্ম এবং কার্যকলাপ সবই দিব্য অপ্রাকৃত।’ ভগবান কারও বা কোন কিছুর অধীন নন। তাঁর ইচ্ছায় সব কিছুই হতে পারে। তাই কারও পুত্ররূপে কিংবা সখারূপে তিনি লীলাবিলাস করতে পারেন। মায়াবদ্ধ জীব আমরা জন্মমৃত্যু গ্রহণ করতে বাধ্য হই। কিন্তু মায়াধীশ শ্রীকৃষ্ণ কোন কিছুতে বাধ্য নন। নরলীলা প্রকাশ করার জন্য তিনি পিতা-মাতার কোলে শিশুরূপে আবির্ভূত হতে পারেন। পরমেশ্বর ভগবানকে পুত্ররূপে লাভ করার জন্য শ্রীনন্দ-যশোদা ও শ্রীবসুদেব-দেবকী জন্মজন্মান্তরে কঠোর তপস্যায় ব্রতী হয়েছেন। এরূপ ঐকান্তিক ভক্তের সন্তোষ বিধান করতে ভগবানও তাঁদের পুত্ররূপে লীলাবিলাস করতে অভিলাষ করেন। আর এই জন্ম ও কর্মলীলা আমাদের জড়বুদ্ধির বিচার্য বিষয় নয়। মানুষরূপে কিংবা অন্য যে কোন রূপে আবির্ভূত হলেও ভগবান সর্ব অবস্থাতেই ভগবান।

‘বেদ’ কথাটির অর্থ হচ্ছে জ্ঞান। অথর্ব বেদে বলা হয়েছে, সৃষ্টির আদিতে প্রজাপতি ব্রহ্মা সেই জ্ঞানপ্রাপ্ত হন শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় (১৫/১৫) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ‘আমিই সমস্ত বেদের জ্ঞাতব্য বিষয়, আমি সমস্ত বেদান্ত কর্তা ও বেদবেত্তা।’ ঋক্ বেদে বলা হয়েছে, ‘শ্রীকৃষ্ণই সৎ, চিদ্ ও আনন্দঘন শ্রীবিগ্রহ, শ্রীকৃষ্ণই আদি পুরুষ, ্শ্রীকৃষ্ণই পুরুষোত্তম, শ্রীকৃষ্ণ সমস্ত কর্মের মূল, সর্বকার্যের উৎস। শ্রীকৃষ্ণ সকলের একমাত্র প্রভু, শ্রীকৃষ্ণ ব্রহ্মা বিষ্ণু শিব ইত্যাদি ঈশ্বর প্রমুখ দেবগণের প্রভু এবং পূজ্য। শ্রীকৃষ্ণ আদিরও আদি অর্থাৎ অনাদি। ব্রহ্মান্ডের অন্তরে ও বাইরে যত মঙ্গল, কৃষ্ণসেবক কৃত্তী ব্যক্তি সেই সমস্ত মঙ্গল শ্রীকৃষ্ণেই লাভ করে থাকেন।’ প্রকৃতপক্ষে সর্ববেদে শ্রীকৃষ্ণকে পরমেশ্বর ভগবান বলা হয়েছে। অন্য কাউকে নয়। ব্রহ্ম হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানের অঙ্গজ্যোতি মাত্র।

পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে, ‘এই ভুবনে সকল লোকের ভগবান শ্রীহরি ছাড়া নিশ্চিতভাবে আর কেউ আরাধ্য নেই। যে কোন সর্বকামদাতা দেবতার অভীষ্টদাতাই হচ্ছেন শ্রীহরি। ভবসমুদ্রের ছেদনকর্তা অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যুর সংসার-বন্ধনরূপ পুনঃ পুনঃ আবর্তনের ছেদনকারী শ্রীহরি বিনা অন্য কেউ নেই।’ সমস্ত দেব-দেবীর উৎস হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। গীতায় তিনি বলেছেন, ‘অহং সর্বস্য প্রভবো’ অর্থাৎ আমিই চরাচর বিশ্বের সব কিছুর উৎস। তিনি আরও বলেছেন, ‘প্রজাপতিরা, রুদ্র এবং অন্য সকলকেই আমি সৃষ্টি করেছি, যদিও তারা তা জানে না। কারণ, তারা আমার মায়াশক্তির দ্বারা বিমোহিত।’ এ কারণেই ভগবানকে বলা হয় ‘অসমোর্ধ্ব’ অর্থাৎ কেউই তাঁর সমান নয়, কেউই তাঁর উর্ধেও নয়। ভগবান হচ্ছেন পরম নিয়ন্তা। সমস্ত দেব-দেবী তাঁর অধীন মাত্র। দেব-দেবীদের সমস্ত ক্ষমতার উৎস স্বয়ং ভগবান। ভগবানই তাঁদের সেই ক্ষমতা দিয়েছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই ভগবানের কৃপার ওপর নির্ভরশীল। প্রজাপতি ব্রহ্মা, মহাদেব শিব সর্বদাই ভগবান শ্রীহরির আরাধনা করেন। জন্ম-মৃত্যুর ভবচক্র থেকে চিরমুক্তি একমাত্র ভগবানই দিতে পারেন, অন্য কেউ নয়। ব্রহ্মা শিবাদি পরমেশ্বর ভগবানের গুণগানেরত। তাঁরা পরম বৈষ্ণব। তাঁরা সর্বদা শ্রীহরির আরাধনায় ব্যাপৃত। সমস্ত বৈদিক শাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণকেই পরমেশ্বর ভগবান বলে ঘোষণা করা হয়েছে। কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ম। সকল দেব-দেবী শ্রীকৃষ্ণের পরমেশ্বরত্ব স্বীকার করে তাঁর আরাধনা করেছেন। তিনি একটি বিশাল পর্বত তুলে কড়ে আঙ্গুলে সাতদিন ধরে রেখেছিলেন। বাঁশি বাজিয়ে সারা ব্রহ্মা- মোহিত করেছিলেন। তিনি সর্বদাই নবযৌবনসম্পন্ন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তিনি তাঁর ভক্ত অর্জুনের রথের সারথি রূপে যখন ছিলেন তখন তাঁর লৌকিক বয়স এক ’শ পঁচিশ বছর।

সেই সময় তাঁর অনেক পুত্র-পৌত্রাদি থাকা সত্ত্বেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে একজন নবীন কিশোর যুবকের মতোই দেখাত। এই যুদ্ধক্ষেত্রেই তিনি তাঁর সখা অর্জুনকে নিজের বিশ্বরূপ দেখিয়েছেন. যা কোন দেব-দেবী দেখাতে পারেনি এবং পারবেও না। শ্রীমদ্ভাগবতের বর্ণনা অনুসারে দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপুর কাছে স্বর্গের সকল দেব-দেবী নতি স্বীকার করে জয়ধ্বনি দিয়ে হিরণ্যকশিপুকে স্বর্গরাজরূপে পূজা বন্দনা করেছিলেন। কিন্তু সেই হিরণ্যকশিপু নিজেকে ভগবানের মতো মনে করায় অচিরেই তিনি পরমেশ্বর ভগবানের হাতে নিহত হন। এই ভগবানকেই ভক্তির ভাবে দড়ি দিয়ে বেঁধেছিলেন মা যশোদা। শ্রীমদ্ভাগবতে (১০/৯/১৩-১৪) বলা হয়েছে, ‘ভগবানের আদি-অন্ত নেই, বাহ্য-অন্তর নেই, পূর্ব-পশ্চাৎ নেই। তিনি সর্বব্যাপ্ত। যেহেতু তিনি কালের নিয়ন্ত্রণাধীন নন, তাই তাঁর কাছে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের কোন পার্থক্য নেই। তিনি তাঁর চিন্ময় স্বরূপে নিত্য-বর্তমান। দ্বৈতভাবের অতীত পরমতত্ত্ব হওয়ার ফলে, যদিও তিনি সব কিছুরই কার্য ও কারণ, তবুও তিনি কার্য-কারণের দ্বৈতভাব থেকে মুক্ত। সেই অব্যক্ত পুরুষ, যিনি সমস্ত ইন্দ্রিয়-অনুভূতির অতীত, তিনি এখন একটি নরশিশুরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। আর মা যশোদা তাঁকে তাঁর পুত্র বলে মনে করে দড়ি দিয়ে উদুখলে বেঁধে রেখেছেন।’ শিশুবস্থা থেকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পুতনা রাক্ষসী, বৎসাসুর, বকাসুর, অঘাসুর, ধেনকাসুর বধ করে, কালীয়নাগকে দমন করে, বনের দাবানল গ্রাস করে যেমন লীলা করেছেন, তেমনি তিনি বৃন্দাবনবাসীসহ তাঁর ভক্তদের প্রতি কৃপা করেছেন উদারভাবে। এ কারণে মানব শিশু হয়ে অবতরণ করলেও তিনি নিজের সৎ-চিৎ-আনন্দময় দেহে পৃথিবীকে রক্ষা করেছেন। আদর্শ রাজা, আদর্শ গৃহস্থ ও আদর্শ বন্ধুর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনের মাধ্যমে জগদ্বাসীকে রক্ষা করেছেন। নররূপে লীলাবিলাস করলেও তিনিই ষড়ৈশ্বর্যে পরিপূর্ণ গোলকনাথ ভগবান শ্রীহরি। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী যে মহাদুর্যোগ করোনা অতিমারী বয়ে যাচ্ছে, এই ক্রান্তিকালে আমরা সবাই ভগবানের শ্রীচরণকমলে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তিনি যেন আমাদের সবাইকে শান্তিদান করেন। এই মহামারী থেকে পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী যেন রক্ষা পায় এই প্রার্থনায় পূর্ণ হোক জন্মাষ্টমীর সব শুভ আয়োজন।

ট্যাগ :