বাংলাদেশ, শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১ ৭ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

মাহে রবিউল আউয়াল মাসের গুরুত্ব ও দয়াল নবীর ধরাধামে শুভাগমন


প্রকাশের সময় :৯ অক্টোবর, ২০২১ ৫:২৬ : অপরাহ্ণ

এস.এম.মাঈন উদ্দীন রুবেলঃ

মাহে রবিউল আউয়াল হিজরী বর্ষের তৃতীয় মাস কিন্তু গুরুত্ব এবং মর্যাদার দিক থেকে এই মাস ঈমানদার মুসলমান ও আশেকে রাসূলগনের অন্তরে এক মহাসম্মানিত আসন অধিকার করে আছে। মাহে রবিউল আউয়াল মাসের গুরুত্ব ও মহত্ত্ব অপরিসীম। ছরকারে দু আলম দু জাহানের বাদশাহ সাইয়্যেদুল মুরসালিন খাতেমুন নবীয়্যিন শফিউল মুজনেবীন রাহমাতুল্লিল আলামিন হাবীবে খোদা হযরত মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর শুভ আগমন এই মাসে। যিনি বিশ্বনবী, শেষ নবী, যার শুভাগমনে ধন্য সমগ্র জগৎ, আলোকিত মক্কার মরুপ্রান্তর, যার কারণে চিরভাস্বর মদিনাতুল মুনাওয়ারাহ। স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যাকে উদ্দেশ্য করে ইরশাদ করেছেন, হে রসূল (সাঃ)সমগ্র জগৎবাসীর জন্য আপনাকে রহমত হেসেবেই প্রেরণ করেছি। ওই আয়াত প্রমাণ করছে রসূলে আকরাম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গোটা সৃষ্টি জগতের জন্য রহমত। আরও ইঙ্গিত বহন করছে আল্লাহ যতটুকুর রব এবং তার প্রিয়বন্ধু হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন ততটুকুর জন্য রহমত। আল্লাহর রুবুবিয়্যাত তথা মালিকানা যে পর্যন্ত বিস্তৃত, ত্রিভূবেনর বাদশা নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুয়ত সে পর্যন্ত ব্যাপিত। মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন যে বরকতপূর্ণ ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত রবিউল আউয়ালে সংঘটিত সঙ্গত সে কারণেই সে মাসটি উম্মতে মোহাম্মদী তথা জগতবাসীর কাছে সম্মানিত, তাৎপর্যমন্ডিত ও মহিমান্বিত।

এই মাসের শুভাগমনে বিশ্বের ঈমানদার মুসলমানদের অন্তরে প্রবাহিত হতে থাকে এক মহব্বতের ফল্গুধারা। সবাই অনুভব করে আনন্দ ও এক অনাবিল প্রশান্তি।
এই সেই রবিউল আউয়াল মাস, যেই মাসে তশরীফ এনেছেন আল্লাহ তবারকা ওয়া তাআলার প্রিয় বন্ধু, প্রিয় হাবীব, আল্লাহর সমস্ত সৃষ্টি জগতের জন্য রহমত বরকত ও মানব জাতির কল্যাণকামী এবং উম্মতের মুক্তিদাতা আখেরী নবী হুজুর পুরনূর (সাঃ), আকায়ে নামদার, শফিউল মুজনেবিন, রহমতুিল্লল আলামিন, হযরত আহমদে মোজতবা মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। ১২ই রবিউল আউয়াল রোজ সোমবার ছোবহে ছাদেকের সময় পবিত্র মক্কা মোয়াজ্জামায় হযরত মা আমেনার (রাঃ) পবিত্র শেকমে পাক থেকে দুনিয়ার বুকে তশরীফ আনলেন হুজুর পুরনূর সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম। হাদীছে পাক এবং অন্যান্য কেতাবের রেওয়ায়েত মতে কোন রকম অপবিত্রতা ব্যতিরেকে সম্পূর্ণ পাক পবিত্র অবস্থায় বেহেশতি পোশাক পরিহিত, চোখে সুরমা দেওয়া আল্লাহর পেয়ারা হাবীব (সাঃ) তশরীফ আনলেন। দুনিয়ার জমিনে তশরীফ এনেই তিনি আল্লাহর দরবারে সেজদায় পড়লেন এবং শাহাদাত অঙ্গুলী উপরে তুলে আল্লাহর একাত্মতা এবং স্বীয় নবুওতের ঘোষণা দিলেন এবং উম্মতের জন্য দোয়া করলেন “রাব্বি হাবলী উম্মতি, রাব্বি হাবলী উম্মতি”।

বিভিন্ন রেওয়ায়েত মতে, হযরত মা আমেনা (রাঃ) বর্ণনা করেন, “আমার শিশু সন্তান যখন ভূমিষ্ঠ হচ্ছিল তখন আমি শুনতে পাচ্ছিলাম অনেক লোকের আওয়াজ। তারা সালাম দিতে দিতে আমার ঘরের দিকে আসছিল।” রেওয়াতে রয়েছে আল্লাহ তবারকা ওয়া তাআলার নির্দেশে হযরত জিবরাঈল (আঃ) এর নেতৃত্বে ঝাণ্ডা নিয়ে মিছিল বা জুুলুস সহকারে হাজার হাজার ফেরেস্তা আখেরী নবী ইমামুল আম্বিয়া নবী করীম (সাঃ) কে মোবারকবাদ ও সালাম আরজ করতে করতে হযরত মা আমেনার (রাঃ) গৃহের দিকে আসছিলেন এবং এই ঝান্ডা পবিত্র কাবা শরীফের উপরে স্থাপন করেন। এই বিষয়টিই চতুর্দশ শতাব্দীর মোজাদ্দেদ আ’লা হযরত আহমদ রেজা খাঁন ফাজেলে বেরলভী (রহঃ) তাঁর কিতাবে উল্লেখ করেছেন- “ফেরেশতোঁ ­­­কী সালামী দেনে ওয়ালী ফৌজ গাতি থী, হযরতে মা আমেনা ছুনতি থী আওয়াজ আতি থী”। আল্লাহর পেয়ারা হাবীব আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (সাঃ) এর ধরাধামে শুভাগমনে পবিত্র দিনটিকে উপলক্ষ করে সারা দুনিয়ার ধর্মপ্রাণ নবী প্রেমিক মুসলমানগণ উদযাপন করেন পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) এর সাধারণত অর্থ ‘ঈদ’ অর্থ আনন্দ আর ‘মিলাদুন্নবী (সাঃ) এর অর্থ হলো পবিত্র জন্মদিন বা খোশরোজ। মিলাদুন্নবী আরবী শব্দ। আভিধানিক অর্থ হচ্ছে নবী (সাঃ) এর শুভাগমন। সুতরাং ‘ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) এর সার্বিক অর্থ দাঁড়ায় নবী করীম (সাঃ) এর শুভাগমন উপলক্ষে আনন্দ বা খুশী উদযাপন করা। এখানে একটি প্রশ্ন থাকতে পারে আমাদের আরো দুটি ঈদ রয়েছে। একটি পবিত্র ঈদ-উল ফিতরের দিন অর্থাৎ শাওয়াল মাসের প্রথম দিন এবং আরেকটি জিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখ ঈদুল আজহা বা পবিত্র কোরবানির ঈদ। এই দুইটা ঈদ আমরা প্রতি বছর উদযাপন করে থাকি। এই দুটি ঈদ দুনিয়ার ধর্মপ্রাণ মুসলমান অতি মর্যাদা সহকারে পালন করে থাকেন। আর পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) এমন একটি অনুষ্ঠানের নাম, একটি দিবসের নাম, একটি কর্মকাণ্ডের নাম যার সাথে জড়িয়ে আছে কুল কায়েনাতের বিশ্বাস, অবস্থান এবং বর্তমান ভবিষ্যৎ। ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) আল্লাহ তবারকা ওয়া তাআলার পক্ষ থেকে এমন এক নেয়ামত যা গ্রহণ, পালন এবং যার শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে থাকেন। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) কেন এত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা হাদীসে কুদসীতে নবী করিম (সাঃ) কে উদ্দেশ্য করে এরশাদ করেন- “লাওলাকা লামা খালাকতুল আফলাক।” অর্থাৎ ‘‘(হে নবী), আমি যদি আপনাকে সৃষ্টি না করতাম তাহলে আমি কিছুই সৃষ্টি করতাম না।” এই হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তবারক ওয়াতাআলা পরিষ্কার করে স্বীয় রসুল (সাঃ) এর সৃষ্টির উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন। এই বিশ্ব জগৎ, আসমান-জমিন, বেহেশত-দোজখ, আরশ-কুরসী সব কিছু সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর প্রিয় হাবীব (সাঃ) কে আঠার হাজার মাখলুকাতের সামনে প্রকাশ করা। শুধু প্রকাশ করা নয় আল্লাহর রহমত স্বরূপ মানবজাতির কল্যাণে দুনিয়ার জমিনে প্রেরণ করা। যেমন, আল্লাহ তাআলা কোরআনে করিমে এরশাদ করেন, “ওয়ামা আরছালনাকা ইল্লা রহমতুল্লিল আলামিন”। অর্থাৎ (হে নবী), আমি আপনাকে সমস্ত সৃষ্টির জন্য শুধুমাত্র রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছি।”

ছবিঃ লেখক ও কবি এস.এম.মাঈন উদ্দীন রুবেল।

ট্যাগ :